ঢাকা রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬, ২৯ চৈত্র ১৪৩২
মুক্ত মনমুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

১০ এপ্রিল ১৯৭১: যখন যুদ্ধের অন্ধকারে জন্ম নেয় একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের আইনি সূর্য

কৃষিবিদ দীপু
১১ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:০৪ পিএম
১১ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:২৯ পিএম
১০ এপ্রিল ১৯৭১: যখন যুদ্ধের অন্ধকারে জন্ম নেয় একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের আইনি সূর্য

কখনো কখনো ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলো খুব নীরবে আসে। চারদিকে তখন যুদ্ধের ধোঁয়া, মানুষের চোখে অনিশ্চয়তা, বুকভরা ভয়—তবু সেই অন্ধকারের মধ্যেই কোথাও জন্ম নেয় একটি নতুন সূর্য। ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল ছিল তেমনই এক দিন। সেই দিনটি হয়তো যুদ্ধের ময়দানে গর্জন তোলা কোনো বড় সামরিক বিজয়ের দিন ছিল না, কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায়, ইতিহাসের বিচারে এবং জাতির আত্মপরিচয়ের প্রশ্নে এটি ছিল একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের আইনি জন্মের দিন।

১৯৭১ সালের মার্চ মাসে উপমহাদেশের ইতিহাসে এক ভয়াবহ অধ্যায় শুরু হয়। পাকিস্তানি সামরিক জান্তা বাঙালির গণতান্ত্রিক অধিকারকে রক্তের বন্যায় ডুবিয়ে দিতে চেয়েছিল। ২৫ মার্চের কালরাতে শুরু হয়েছিল নির্মম গণহত্যা। ঢাকা শহর থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ট্যাংক, মেশিনগান আর আগুনের ভয়াবহতা নেমে আসে। সেই ভয়াবহ সময়েই ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার প্রাক্কালে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেই ঘোষণা কেবল একটি রাজনৈতিক বক্তব্য ছিল না; সেটি ছিল একটি জাতির অস্তিত্ব রক্ষার আহ্বান।

২৬ মার্চ ১৯৭১ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীনতার পথে যাত্রা শুরু করে, কিন্তু দেশ তখনো দখল করে রেখেছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের এ দেশীয় দোসর রাজাকার ও আলবদর বাহিনী। দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য এক সাগর রক্ত আর লাখো মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে শেষ পর্যন্ত শত্রুদের পরাজিত করে অর্জিত হয় চূড়ান্ত বিজয়—১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১।

এই মহান মুক্তিযুদ্ধ কোনো বিশৃঙ্খল প্রতিরোধ ছিল না; এটি পরিচালিত হয়েছিল একটি বৈধ সরকারের অধীনে। সেই সরকারই গঠিত হয় ১০ এপ্রিল ১৯৭১ সালে। ১৯৭০ সালের জাতীয় নির্বাচনে বাংলার জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে গঠিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার।

স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার পরই একটি বড় প্রশ্ন সামনে আসে—এই যুদ্ধ কে পরিচালনা করবে? কীভাবে পরিচালিত হবে একটি নবজাত রাষ্ট্রের সংগ্রাম? যুদ্ধের আবেগ যতই প্রবল হোক না কেন, রাষ্ট্র গঠনের জন্য প্রয়োজন সংগঠিত রাজনৈতিক নেতৃত্ব, প্রশাসনিক কাঠামো এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তি। সেই প্রয়োজন থেকেই মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নেই তৎকালীন আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা ভারতের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে একত্রিত হন। যুদ্ধের মধ্যেই তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন—বাংলাদেশের একটি বৈধ সরকার গঠন করতে হবে।

১০ এপ্রিল ১৯৭১ সালে সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবে রূপ নেয়। গঠিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার, যা ইতিহাসে অধিক পরিচিত বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার বা মুজিবনগর সরকার নামে। এই সরকারের রাষ্ট্রপতি করা হয় পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি থাকা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। তাঁর অনুপস্থিতিতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন জাতীয় চার নেতার অন্যতম সৈয়দ নজরুল ইসলাম। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান সংগঠক তাজউদ্দীন আহমদ।

মন্ত্রিসভার অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে ছিলেন অর্থ, শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী এম মনসুর আলী এবং স্বরাষ্ট্র, ত্রাণ ও পুনর্বাসনমন্ত্রী এ এইচ এম কামারুজ্জামান। এই নেতৃবৃন্দই যুদ্ধকালীন সময়ের রাজনৈতিক, প্রশাসনিক এবং কূটনৈতিক দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

তবে ১০ এপ্রিলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র অনুমোদন। এই ঘোষণাপত্র ছিল একটি নবজাত রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ভিত্তি। এতে বলা হয় যে, ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু যে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন, তা জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে আইনগত স্বীকৃতি পেল। অর্থাৎ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ছিল জনগণের গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্তের ফল।

এই ঘোষণাপত্রে আরও বলা হয় যে, নতুন রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য হবে সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। যতদিন পর্যন্ত একটি পূর্ণাঙ্গ সংবিধান প্রণয়ন না হয়, ততদিন এই ঘোষণাপত্রই রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় এটি ছিল বাংলাদেশের প্রথম সাংবিধানিক দলিল—একটি স্বাধীন জাতির আইনি জন্মসনদ।

১০ এপ্রিলের আগে মুক্তিযুদ্ধের প্রতিরোধ ছিল অনেকাংশে বিচ্ছিন্ন ও স্বতঃস্ফূর্ত। কিন্তু একটি বৈধ সরকার গঠনের মাধ্যমে সেই প্রতিরোধ যুদ্ধ একটি সুসংগঠিত জাতীয় মুক্তিযুদ্ধে রূপ নেয়। মুক্তিযোদ্ধারা একটি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অধীনে সংগঠিত হতে শুরু করেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের পক্ষে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার হয় এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বুঝতে পারে যে বাঙালির সংগ্রাম একটি পরিকল্পিত রাজনৈতিক আন্দোলন।

১০ এপ্রিলের বৈঠকেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, নবগঠিত সরকার বাংলাদেশের মাটিতেই আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করবে। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহাসিক শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান। পরবর্তীকালে সেই স্থানটি পরিচিত হয় 'মুজিবনগর' নামে এবং ইতিহাসে এই সরকার পরিচিত হয়ে যায় 'মুজিবনগর সরকার' হিসেবে।

সেদিনের সেই শপথ ছিল এক অর্থে পুরো জাতির শপথ—স্বাধীনতার জন্য শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত লড়াই করার অঙ্গীকার।

আজ এত বছর পর ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকালে আমরা বুঝতে পারি, ১০ এপ্রিল ১৯৭১ ছিল একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও আইনি ভিত্তি নির্মাণের দিন। যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও বাঙালি নেতৃত্ব সেদিন প্রমাণ করেছিল—স্বাধীনতা কেবল আবেগের বিষয় নয়, এটি একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া।

দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, অগণিত শহীদের আত্মত্যাগ এবং লাখো মানুষের দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে অবশেষে অর্জিত হয় স্বাধীনতা। সেই বিজয়ের পথে ১০ এপ্রিল ছিল এক অনিবার্য সূচনা। তাই ইতিহাসের পাতায় এই দিনটি কেবল একটি তারিখ নয়; এটি একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের আইনি জন্মের দিন, একটি জাতির রাজনৈতিক প্রজ্ঞার প্রতীক এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়।

লেখক: পেশাজীবী ও কলামিস্ট

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

রক্ষাকালী মন্দির গণহত্যা: পাবনার এক রক্তাক্ত অধ্যায়

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে তাজউদ্দীন আহমদের প্রথম ভাষণ

১১ এপ্রিল ১৯৭১: তাজউদ্দীন আহমদের ভাষণ ও সংগঠিত প্রতিরোধের সূচনা

১০ এপ্রিল ১৯৭১: বাংলাদেশের প্রথম সরকার ও স্বাধীনতার সনদ

১০ এপ্রিল ১৯৭১: যখন যুদ্ধের অন্ধকারে জন্ম নেয় একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের আইনি সূর্য

০৫ এপ্রিল ১৯৭১: বহুমুখী যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

৩১ মার্চ ১৯৭১: নাথপাড়ার রক্তগঙ্গা ও বিশ্ববিবেকের গর্জন

৩০ মার্চ ১৯৭১: প্রতিরোধের আগুন ও বিশ্ববিবেকের জাগরণ

ইতিহাসের অবিনশ্বর নক্ষত্র: শহীদ শাফী ইমাম রুমী

২৯ মার্চ ১৯৭১: প্রতিরোধের আগুন ও আত্মাহুতির এক নৃশংস অধ্যায়

১০

বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা,আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশ

১১

২৮ মার্চ ১৯৭১: ধ্বংসযজ্ঞের ছাপ আর বাঙালির সুসংগঠিত প্রতিরোধ

১২

২৭ মার্চ ১৯৭১: বিশ্ব জানল, বাংলাদেশ স্বাধীন

১৩

২৬ মার্চ ১৯৭১: একটি জাতির রক্তক্ষয়ী সূর্যোদয় ও স্বাধীনতার ঘোষণা

১৪

গণহত্যার বিরুদ্ধে শৈল্পিক প্রতিবাদ / ২৫শে মার্চের কালরাত্রি স্মরণে প্রাচ্যনাটের ‘লালযাত্রা’

১৫

২৫ মার্চ, ১৯৭১: ইতিহাসের কলঙ্কিত কালরাত ও বিভীষিকাময় গণহত্যা

১৬

২৪ মার্চ ১৯৭১: প্রতিরোধের আগুন আর চূড়ান্ত প্রস্তুতির দিন

১৭

২৫ মার্চের গণহত্যা স্মরণে ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির দাবিতে ‘আলোর মিছিল’

১৮

২৫ মার্চ ১৯৭১: গণহত্যার কালরাত্রি ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির লড়াই

১৯

জামায়াতকে বিচারের আওতায় আনার দাবি / একাত্তরের গণহত্যা স্বীকৃতির প্রস্তাব মার্কিন কংগ্রেসে

২০