

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ১৯৭১ সালের ১১ এপ্রিল ছিল একটি বাঁক পরিবর্তনের দিন। একদিকে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা তাদের নৃশংসতা বাড়াতে জেনারেল নিয়াজিকে দায়িত্ব দিচ্ছে, অন্যদিকে নবগঠিত বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ বেতার ভাষণের মাধ্যমে মুক্তিকামী জনতাকে সুসংগঠিত হওয়ার ডাক দিচ্ছেন। দেশি-বিদেশি সংবাদমাধ্যম ও ঐতিহাসিক দলিল পর্যালোচনায় এই দিনের ঘটনাবলি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ভিতকে আরও মজবুত করেছিল।
তাজউদ্দীন আহমদের ঐতিহাসিক বেতার ভাষণ
এদিন আকাশবাণী ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে জাতির উদ্দেশ্যে এক দীর্ঘ ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ। এই ভাষণটি কেবল একটি বক্তব্য ছিল না, বরং এটি ছিল একটি যুদ্ধরত জাতির জন্য রণকৌশল ও আশার বাণী।
সংগ্রামের স্বীকৃতি: তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষ থেকে সংগ্রামী অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, ২৫ মার্চের হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর দেওয়া স্বাধীনতার ঘোষণা আজ বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের প্রেরণা।
মুক্তাঞ্চল ঘোষণা: তিনি সিলেট, কুমিল্লা, নোয়াখালী এবং চট্টগ্রামের বৃহৎ অংশকে 'মুক্ত এলাকা' হিসেবে ঘোষণা করেন। বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও কালুরঘাটের প্রতিরোধকে তিনি বিশ্বখ্যাত 'স্ট্যালিনগ্রাড' যুদ্ধের বীরত্বের সঙ্গে তুলনা করেন।
সামরিক কমান্ডের বিন্যাস: ভাষণে তিনি মেজর খালেদ মোশাররফ, মেজর শফিউল্লাহ, মেজর জলিল এবং মেজর আহমদের বীরত্বের প্রশংসা করেন। এটি বিশ্বকে এই বার্তা দেয় যে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ কোনো বিচ্ছিন্ন বিদ্রোহ নয়, বরং একটি সুশৃঙ্খল সামরিক নেতৃত্বের অধীনে পরিচালিত জনযুদ্ধ।
আন্তর্জাতিক আহ্বান: তিনি রেডক্রসসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনের আহ্বান জানান এবং বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর কাছে অস্ত্র সাহায্যের আবেদন করেন।
পাকিস্তানি সামরিক জান্তার চাল বদল
১১ এপ্রিল পাকিস্তান সেনাবাহিনী তাদের কমান্ড কাঠামোতে পরিবর্তন আনে। জেনারেল টিক্কা খানের স্থলাভিষিক্ত করে লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজিকে পূর্ব পাকিস্তান কমান্ডের অধিনায়ক নিযুক্ত করা হয়। নিয়াজির এই নিয়োগ ছিল বাঙালির প্রতিরোধ দমনে আরও কঠোর ও নিষ্ঠুর হওয়ার এক ইঙ্গিত।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মেরুকরণ: চীন ও ভারতের ভূমিকা
এই দিনে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও উত্তাপ ছড়ায়:
চীনের অবস্থান: চীনের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাই পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে পাঠানো এক চিঠিতে পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতিকে 'অভ্যন্তরীণ বিষয়' বলে অভিহিত করেন। তিনি ভারতকে সতর্ক করে বলেন, পাকিস্তান আক্রান্ত হলে চীন সমর্থন দেবে। চীনের মুখপত্র 'পিপলস ডেইলিতে'ও ভারতের ভূমিকার সমালোচনা করা হয়।
ভারতের জনমত: উল্টো চিত্র দেখা যায় ভারতে। কলকাতায় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী অজয় মুখোপাধ্যায় এবং বিহারের মুখ্যমন্ত্রী কর্পুরী ঠাকুর অবিলম্বে বাংলাদেশ সরকারকে কূটনৈতিক স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানান।
যুদ্ধের ময়দান: বীরত্ব ও আত্মত্যাগ
দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ১১ এপ্রিল ছিল প্রচণ্ড যুদ্ধের দিন:
কুষ্টিয়া ও যশোর: কুষ্টিয়ায় মুক্তিবাহিনীর ঐতিহাসিক বিজয়ের পর পাকিস্তানি সেনারা যশোর সেনানিবাসে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। বেনাপোল ও ঝিকরগাছায় সম্মুখ যুদ্ধে হানাদারদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।
কালুরঘাট প্রতিরোধ: চট্টগ্রামের কালুরঘাটে আধুনিক মারণাস্ত্রের মুখেও ৮ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। গুরুতর আহত অবস্থায় বন্দি হন বীর মুক্তিযোদ্ধা শমসের মুবিন চৌধুরী।
পাবনা ও গোপালগঞ্জ: ঈশ্বরদীতে বিহারি ও পাকিস্তানি সেনাদের যৌথ তাণ্ডবে ৩২ জন বাঙালি শহীদ হন। অন্যদিকে গোপালগঞ্জের মানিকহারে রাজাকারদের সহযোগিতায় হানাদাররা অগ্নিসংযোগ ও লুণ্ঠন চালায়।
দিনাজপুর ও কালিগঞ্জ: দিনাজপুরের ফুলবাড়িতে তৃতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্ট তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে। কালিগঞ্জে কালামিয়া নামের এক বীর মুক্তিযোদ্ধার নেতৃত্বে পরিচালিত অ্যামবুশে ১০ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়; এই অভিযানে তিনি নিজেই গ্রেনেড হাতে ধাওয়া করতে গিয়ে শহীদ হন।
আট নৌ-সেনার বিদ্রোহ
মুক্তিসংগ্রামের একটি অনন্য ঘটনা ঘটে এই দিনে। ফ্রান্সের তুলন (Toulon) বন্দরে অবস্থানরত পাকিস্তানের সাবমেরিন ‘পিএনএস ম্যাঙ্গো’ থেকে আটজন বাঙালি নৌ-সেনা বিদ্রোহ করে ভারতের আশ্রয়ে চলে আসেন। এই সাহসী পদক্ষেপটি পরবর্তীকালে নৌ-কমান্ডো গঠনের অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে।
১১ এপ্রিল ১৯৭১ প্রমাণ করেছিল যে, সাড়ে সাত কোটি মানুষের এই লড়াই কেবল আবেগের নয়, বরং একটি পরিকল্পিত রাজনৈতিক ও সামরিক প্রক্রিয়ার অংশ। তাজউদ্দীন আহমদের ভাষায়, "শহীদের রক্ত বৃথা যেতে পারে না। ইনশাআল্লাহ, জয় আমাদের সুনিশ্চিত।" সেদিনের সেই অদম্য মনোবলেই রচিত হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ।
তথ্যসূত্র
১. বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র (ত্রয়োদশ খণ্ড)।
২. আনন্দবাজার পত্রিকা ও দৈনিক পাকিস্তান (১২ এপ্রিল ১৯৭১ সংস্করণ)।
৩. রক্তে ভেজা একাত্তর — মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ (বীর বিক্রম)।
৪. মূলধারা '৭১ — মঈদুল হাসান।
মন্তব্য করুন