
১৯৭১ সালের মার্চ ছিল বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের চূড়ান্ত পর্ব। ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের পর অসহযোগ আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ২৩ মার্চ ‘পাকিস্তান দিবসে’ বাংলার ঘরে ঘরে ওড়ে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। এর ঠিক পরের দিন—২৪ মার্চ—ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ দিন, যেদিন একদিকে চলেছে শেষ মুহূর্তের আলোচনা, অন্যদিকে বাঙালির প্রতিরোধ জ্বলে উঠেছে চট্টগ্রামের জেটি থেকে সৈয়দপুরের গ্রামে। আর এই দিনেই শেষ হয়েছে যুদ্ধের প্রস্তুতি, মাত্র এক দিন বাকি ছিল সেই কালরাতের।
বঙ্গবন্ধুর ভাষণ: ‘আর আলোচনা নয়, এবার ঘোষণা চাই’
২৪ মার্চ সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাসভবনে বিভিন্ন সময়ে সমাগত মিছিলকারীদের উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রায় বিরামহীনভাবে ভাষণ দেন। তিনি ঘোষণা করেন:
“আর আলোচনা নয়, এবার ঘোষণা চাই। আগামীকালের মধ্যে সমস্যার কোনও সমাধান না হলে বাঙালি নিজেদের পথ বেছে নেবে।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা সাড়ে সাত কোটি মানুষ আজ ঐক্যবদ্ধ। কোনও ষড়যন্ত্রই আমাদের দাবিয়ে রাখতে পারবে না।”
সরকারের প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে তিনি স্পষ্ট করে দেন, “বাংলার জনগণের ওপর কোনও সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হলে তা বরদাস্ত করা হবে না।” এক পর্যায়ে তিনি আবেগাক্রান্ত হয়ে বলেন, “আমি কঠোর সংগ্রামের জন্য বেঁচে থাকব কিনা জানি না। আপনারা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। মানুষের মতো স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকব, নয়তো সংগ্রামে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাব।”
শেষ মুহূর্তের আলোচনা: আশার আলো নয়, প্রহসনের আয়োজন
এদিন সকালে ও সন্ধ্যায়—দুই দফায় প্রেসিডেন্ট ভবনে আওয়ামী লীগ ও সরকারের মধ্যে উপদেষ্টা পর্যায়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। আওয়ামী লীগের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ ও ড. কামাল হোসেন। অন্যদিকে সামরিক জান্তার পক্ষে আলোচনায় অংশ নেন এম এম আহম্মদ, বিচারপতি এ আর কর্নেলিয়াস, লে. জেনারেল পীরজাদা ও কর্নেল হাসান।
প্রায় দুই ঘণ্টা স্থায়ী প্রথম বৈঠক শেষে তাজউদ্দীন আহমদ সাংবাদিকদের জানান, “আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বক্তব্য প্রদান শেষ হয়েছে। এখন প্রেসিডেন্টের উচিত তার দিক থেকে সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা।” তিনি আরও বলেন, “আলোচনা অনির্দিষ্টকাল চলতে পারে না। আওয়ামী লীগ আলোচনা আর দীর্ঘায়িত করতে প্রস্তুত নয়।”
সন্ধ্যার বৈঠক শেষে তাজউদ্দীন আহমদের মন্তব্য আরও কঠোর হয়: “ইয়াহিয়ার কাছে দাবি জানালে কোনও কাজ হবে বলে মনে হয় না। বল এখন প্রেসিডেন্টের কোর্টে।”
‘সোয়াত’ জাহাজ প্রতিরোধ: অস্ত্র নামাতে দিলাম না
২৪ মার্চ ছিল ‘সোয়াত জাহাজ প্রতিরোধ দিবস’ নামে পরিচিত। এইদিন করাচি থেকে ৫ হাজার ৬৩০ টন অস্ত্র নিয়ে ‘এম. ভি. সোয়াত’ জাহাজটি চট্টগ্রাম বন্দরের ১৭ নম্বর জেটিতে নোঙর করে। অস্ত্র খালাস করতে গেলে প্রায় ৫০ হাজার বীর বাঙালি জেটি এলাকা ঘিরে ফেলে।
পাকিস্তানি সেনা অফিসারদের মুখের ওপর বাঙালি শ্রমিকরা অস্ত্র নামাতে অস্বীকৃতি জানায় এবং জাহাজটি অবরোধ করে রাখে। সেনাবাহিনীর সদস্যরা কিছু অস্ত্র নিজেরাই খালাস করে ১২টি ট্রাকে করে নিয়ে যাওয়ার সময় জনতা পথরোধ করে। এক পর্যায়ে পাকিস্তানি সৈন্যরা নিরস্ত্র জনতার ওপর নির্বিচারে গুলি চালায়। প্রতিবেদনে ২০০ জন শ্রমিক শহীদ হন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
উত্তাল সারা বাংলা: সৈয়দপুর, রংপুর, যশোর
২৪ মার্চ শুধু ঢাকা ও চট্টগ্রাম নয়, উত্তাল ছিল গোটা দেশ।
সৈয়দপুরে গণহত্যা: ২৩ মার্চ রাত থেকে ২৪ মার্চ সকাল পর্যন্ত পাকিস্তানি সেনাবাহিনী সৈয়দপুর সেনানিবাসের পার্শ্ববর্তী বোতলাগাড়ী, গোলাহাট ও কুন্দুল গ্রাম ঘেরাও করে অবাঙালিদের সঙ্গে নিয়ে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালায়। এতে ১০০ জন নিহত এবং এক হাজারেরও বেশি মানুষ আহত হয়।
রংপুরে সংঘর্ষ: রংপুর হাসপাতালের সামনে ক্রুদ্ধ জনতা ও সেনাবাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানি সেনারা রংপুর সেনানিবাস সংলগ্ন এলাকায় নিরস্ত্র অধিবাসীদের ওপর বেপরোয়াভাবে গুলিবর্ষণ করে। এতে কমপক্ষে ৫০ জন নিহত এবং বহু লোক আহত হয়।
যশোরে পতাকা উত্তোলন: দেশের বিভিন্ন স্থানে রাইফেলস ব্যাটালিয়নে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনের খবর দ্রুত পৌঁছে যায় সামরিক জান্তা জেনারেল ইয়াহিয়ার কাছে। পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলসের যশোর ট্রাংক রোডের অফিসেও এদিন উড়ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। ইপিআরের বাঙালি জওয়ানরা ‘জয় বাংলা’ গান গাইতে গাইতে পতাকা উত্তোলন করে।
মিরপুরের ঘটনা: সারাদেশে শান্তিপূর্ণভাবে পতাকা উত্তোলন হলেও মিরপুরের ১০ নম্বর সেক্টরে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। অভিযোগ ওঠে, সেখানে অবাঙালিরা সাদা পোশাকধারী পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সদস্যদের সহযোগিতায় বাঙালিদের ছাদ থেকে বাংলাদেশের পতাকা নামিয়ে জোর করে পাকিস্তানি পতাকা তোলে। বাংলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক কাইয়ুমকে ছুরিকাহত করে তার বাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। রাতে বিহারিরা ব্যাপক বোমাবাজি করে আতঙ্ক সৃষ্টি করে।
ঢাকা টিভি বন্ধ: সংস্কৃতিজনদের প্রতিরোধ
পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নির্বিচার গুলি, আন্দোলনরত বাঙালির ওপর নির্যাতন ও পাকিস্তানের পক্ষে অনুষ্ঠান প্রচারের চাপের মুখে ঢাকা টেলিভিশন কেন্দ্রের সর্বস্তরের বাঙালি শিল্পী-কলাকুশলী কাজ বর্জন করে কর্মস্থল ত্যাগ করেন। টিভি কেন্দ্রে প্রহরারত সৈন্যরা টিভি কর্মীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করলে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ঢাকা টিভির সম্প্রচার বন্ধ হয়ে যায়।
পশ্চিম পাকিস্তানি নেতাদের ঢাকা ত্যাগ
২৪ মার্চ থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানি নেতারা একে একে ঢাকা ত্যাগ করতে শুরু করেন। ছোট ছোট সংসদীয় দলের সব নেতাই এইদিন করাচির উদ্দেশে ঢাকা ছাড়েন। ভুট্টোর সফরসঙ্গী ১৩ জনের মধ্যে ৭ জন এইদিন ঢাকা ত্যাগ করেন।
ইয়াহিয়া খানের আমন্ত্রণে পাকিস্তান থেকে খান আবদুল কাইয়ুম ঢাকায় আসেন। তিনি ইয়াহিয়া ও ভুট্টোর সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে জুলফিকার আলী ভুট্টো সাংবাদিকদের বলেন, “পূর্ব পাকিস্তান বাস্তবিকই শোষণ ও বঞ্চনার শিকার।” কিন্তু সেই সঙ্গে তিনি পাকিস্তান অখণ্ড রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
‘অপারেশন সার্চলাইট’ চূড়ান্ত প্রস্তুতি
এদিন দেশের বিভিন্ন স্থানে ইপিআর ব্যাটালিয়নে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনের খবর ক্রুদ্ধ করে তোলে ইয়াহিয়া-টিক্কা জান্তাকে। তারা গোপনে বৈঠক করে বাঙালি নিধন কর্মসূচি ‘অপারেশন সার্চলাইট’ বাস্তবায়নের নীলনকশা চূড়ান্ত করে। স্বাধীনতাবিরোধী চক্রের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ রক্ষার পাশাপাশি তারা রাজাকার-আলবদর বাহিনী গঠনের প্রস্তুতি গ্রহণ করে।
বঙ্গবন্ধু আগেই বুঝতে পেরেছিলেন আসন্ন বিপদের ইঙ্গিত। তোফায়েল আহমদের স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়, ২২ মার্চ কর্নেল ওসমানী যখন জিজ্ঞাসা করেছিলেন কখন ‘ক্র্যাকডাউন’ হতে পারে, বঙ্গবন্ধু নিখুঁতভাবে বলেছিলেন, “ইট উইল বি টুয়েন্টি ফিফথ” ।
ওয়ালি খান ও মীর গাউস বখশ বিজেঞ্জোয়ার সঙ্গে শেষবারের মতো দেখা করার সময় বঙ্গবন্ধু তাঁদের বলেছিলেন, “ভালো হয় যদি আপনারা দুজন ঢাকা ছেড়ে চলে যান। সেনাবাহিনী দুদিনের মধ্যেই আমাদের আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।”
তথ্যসূত্র
১. বাংলাদেশের স্বাধীনতা. (n.d.). উইকিপিডিয়া.
২. একাত্তরের এই দিনেঃ ২৪ মার্চ, ১৯৭১. (n.d.). Facebook.
৩. ২৪ মার্চ ১৯৭১, কী ঘটেছিল সেদিন. (২০২০, মার্চ ২৪). একুশে টেলিভিশন.
৪. ২৪ মার্চ, ১৯৭১: গণহত্যার প্রস্তুতি চূড়ান্ত, একে একে ঢাকা ছাড়ে পাকিস্তানী নেতারা. (২০১৮, মার্চ ২৪). বিডি-জার্নাল.
৫. মার্চের উত্তাল দিন. (২০২১, মার্চ ২৫). প্রথম আলো.
৬. পঁচিশে মার্চের স্মৃতি. (২০২১, মার্চ ২৫). দ্য ডেইলি স্টার.
মন্তব্য করুন