
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বাঙালির ইতিহাসে এক মহিমান্বিত ও বেদনাবিধুর দিন। ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নামে নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর যে পৈশাচিক গণহত্যা শুরু করেছিল, তার প্রতিরোধে এই দিনেই ঘোষিত হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতা। রক্তিম সূর্যোদয়ের মধ্য দিয়ে সূচিত হয় সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয়।
স্বাধীনতার ঘোষণা: বঙ্গবন্ধুর শেষ বার্তা
২৫শে মার্চ রাত ১২টার পর অর্থাৎ ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।
বার্তার মাধ্যম: বঙ্গবন্ধুর এই ঘোষণাটি ইপিআরের (ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস) ওয়্যারলেস ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে সারাদেশে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। লন্ডনের 'ডেইলি টেলিগ্রাফ' পত্রিকার সাংবাদিক ডেভিড লোশাক এবং পাকিস্তানি মেজর সিদ্দিক সালিকের বর্ণনা মতে, এই ঘোষণাটি সম্ভবত আগে থেকেই রেকর্ড করা ছিল।
ঘোষণার মূল বক্তব্য: “এটাই হয়তো আমার শেষ বার্তা। আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। বাংলাদেশের মানুষ যে যেখানে আছেন, আপনাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে দখলদার সেনাবাহিনীর মোকাবেলা করার জন্য আমি আহ্বান জানাচ্ছি। পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর শেষ সৈন্যটিকে বাংলাদেশের মাটি থেকে উৎখাত করা এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত আপনাদের সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে।”
কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র ও প্রচার
২৬শে মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার এই ঘোষণাপত্র পাঠ করা হয়। দুপুর ২টা ১০ মিনিট ও ২টা ৩০ মিনিটে চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম এ হান্নান প্রথম এই ঘোষণা পাঠ করেন। পরবর্তীতে ২৭শে মার্চ মেজর জিয়াউর রহমানও বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। এই কেন্দ্রটিই মুক্তিযুদ্ধ ও জনগণকে সংগঠিত করতে প্রাথমিক চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ
২৬শে মার্চ ভোরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা এক বিভীষিকাময় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। পাকিস্তানি সেনারা ইকবাল হল (বর্তমানে জহুরুল হক হল), জগন্নাথ হল এবং রোকেয়া হলে পৈশাচিক বর্বরতা চালায়।
শহীদ শিক্ষকগণ: ড. জি সি দেব, ড. মুনিরুজ্জামান, অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য্য এবং জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতাসহ নয়জন শিক্ষককে তাঁদের নিজ বাসভবনে হত্যা করা হয়।
শিক্ষার্থী ও কর্মচারী: জগন্নাথ হলের ৬৬ জনসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ১৯৫ জন ছাত্র-ছাত্রী ও কর্মচারীকে অত্যন্ত নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। মধুর ক্যান্টিনের প্রতিষ্ঠাতা মধুসূদন দে-কেও এই দিন সপরিবারে হত্যা করে পাকিস্তানিরা।
রোকেয়া হল: এই হলের অন্তত ছয়জন ছাত্রীর নগ্ন মরদেহ পা-বাঁধা অবস্থায় পাওয়া যায়, যা পাকিস্তানি সেনাদের পাশবিক নির্যাতনের সাক্ষ্য দেয়।
প্রতিরোধ ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
ঢাকায় যখন কারফিউ জারি করে ভারী মেশিনগান ও কামানের গোলার মাধ্যমে গণহত্যা চালানো হচ্ছিল, তখন সারাদেশে গড়ে ওঠে প্রতিরোধ।
সশস্ত্র প্রতিরোধ: রাজারবাগ পুলিশ লাইনস ও পিলখানা ইপিআরে বাঙালি সদস্যরা সীমিত শক্তি নিয়েই পাকিস্তানি সেনাদের ভারী অস্ত্রের মোকাবিলা শুরু করেন। চট্টগ্রাম, নওগাঁ ও জয়দেবপুরেও প্রতিরোধ যুদ্ধের সূচনা হয়।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম: ২৬শে মার্চ সকালে আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্র থেকে ঢাকায় যুদ্ধ শুরুর খবর প্রচার করা হয়। অস্ট্রেলিয়ার এবিসি রেডিও ঢাকার গণহত্যার খবর বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দেয়।
ইয়াহিয়া খানের ভাষণ: সন্ধ্যায় রেডিও পাকিস্তানে এক ভাষণে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান আওয়ামী লীগকে 'নিষিদ্ধ' ঘোষণা করেন এবং বঙ্গবন্ধুকে 'দেশদ্রোহী' আখ্যা দেন।
২৬শে মার্চ ছিল দীর্ঘ পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার দিন। একদিকে স্বজন হারানোর তীব্র শোক, অন্যদিকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বপ্নে বিভোর সাড়ে সাত কোটি বাঙালির অদম্য সাহস—এই দুইয়ের সমন্বয়েই শুরু হয়েছিল বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রাম। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর যা পূর্ণতা পায় ১৬ই ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয়ের মাধ্যমে।
তথ্যসূত্র
রবীন্দ্রনাথ ত্রিবেদী, ’৭১ এর দশমাস।
সিদ্দিক সালিক, উইটনেস টু সারেন্ডার।
বাংলাদেশ স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র: তৃতীয় খণ্ড (তথ্য মন্ত্রণালয়)।
বিবিসি বাংলা, ডয়চে ভেলে এবং তোফায়েল আহমেদের স্মৃতিচারণমূলক নিবন্ধ।
সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী (স্বাধীনতার ঘোষণা অন্তর্ভুক্তিকরণ)।
মন্তব্য করুন