

হামের ভয়াবহতায় কাঁপছে বাংলাদেশ। গত ১৫ মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই মহামারিতে ইতোমধ্যে প্রাণ হারিয়েছে ২৩৫ জনের বেশি শিশু। মৃত্যুর এই মিছিল যেন থামার নামই নিচ্ছে না। প্রতিদিন গড়ে ৩ থেকে ৫ জন শিশু হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে। আর এই মৃত্যুর অধিকাংশই ঘটছে ঢাকায়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, গত ২৪ ঘণ্টাতেই হামের উপসর্গ নিয়ে ঢাকায় চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গতকাল সারাদেশে আরও পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম।
যে কোনো মহামারির চেয়েও ভয়াবহ এই সংকট
১৯৭১ সালের পর বাংলাদেশ এত ভয়াবহ হাম মহামারির মুখোমুখি হয়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি বাংলাদেশের近代 ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাণঘাতী হাম মহামারি। গত ১৫ মার্চ থেকে শনিবার পর্যন্ত সারাদেশে হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ২৬ হাজার ৯১১ জন শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছে ২৩ হাজার ২২৫ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে নতুন করে ৭২ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। পাশাপাশি এই সময়ে আরও ১ হাজার ২৪ জন শিশুর মধ্যে রোগটির উপসর্গ দেখা গেছে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে শনিবার পর্যন্ত মোট ৩৯ হাজার ৩২৫ জন শিশুর মধ্যে হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে। সেই সঙ্গে এই সময়ে মোট ৫ হাজার ২১৮ জন শিশুর হাম শনাক্ত হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বলছে, এ পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে। আর সন্দেহভাজন মৃত্যুর সংখ্যা ১৬৬ জন। তবে বাস্তবে মৃতের সংখ্যা আরও অনেক বেশি বলে ধারণা করছে সংস্থাটি।
নবজাতকও রক্ষা পাচ্ছে না
এই মহামারিতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে নয় মাসের কম বয়সী শিশুরা। নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে শিশুদের ৯ মাস বয়সে হামের টিকা দেওয়া হয়। কিন্তু এই মহামারিতে আক্রান্তদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশের বয়সই ৯ মাসের কম। অর্থাৎ, টিকা পাওয়ার বয়স হওয়ার আগেই তারা আক্রান্ত হচ্ছে।
একটি তিন বছর বয়সী শিশুর করুণ মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে। শিশুটির বাবা মো. সাজিব বলেন, "ছেলের শরীরে র্যাশ দেখে আমরা দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাই। পাঁচ দিন পর আমরা ফিরি মৃত অবস্থায়। তার উচ্চ জ্বর ও শ্বাসকষ্ট ছিল"। শিশুটির মৃতদেহ বহনকারী আত্মীয়ের ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে শোকের ছায়া নেমে আসে সবার মনে।
কোথায় পেলাম, কোথায় হারালাম?
বাংলাদেশ একসময় হাম নিয়ন্ত্রণে সাফল্যের দৃষ্টান্ত ছিল। ২০২০ সালে সর্বশেষ বড় আকারের টিকাদান কর্মসূচি চালানো হয়েছিল। এরপর প্রতি চার বছর পর পর এই কর্মসূচি নেওয়ার কথা থাকলেও ২০২৪ সালের জুনে নির্ধারিত ক্যাম্পেইনটি হয়নি। কেন?
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা টিকাদান কর্মসূচি বিলম্বিত করে। কিন্তু শুধু অস্থিরতাই দায়ী নয়। সাময়িক সরকার টিকা সংগ্রহের প্রক্রিয়া পরিবর্তন করে ইউনিসেফের সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি বাতিল করে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি চালু করে—যা ইউনিসেফের কঠোর আপত্তি সত্ত্বেও করা হয়। যার ফলে টিকা সংগ্রহে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয় এবং ভ্যাকসিনের সংকট দেখা দেয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে টিকার মজুত শেষ হয়ে গিয়েছিল। তাতে করে ২০২০ সালের পর আর কোনো বড় ক্যাম্পেইন না হওয়ায় বিপুল সংখ্যক শিশু টিকার আওতার বাইরে থেকে যায়।
সরকারি ব্যাখ্যা ও করণীয়
বর্তমান সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর আঙুল উঠলেও নতুন সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেও হাউজে স্বীকার করেছেন যে ভ্যাকসিন সংগ্রহের ব্যর্থতা ঘটেছে।
দেশের ১৮টি উচ্চঝুঁকিপূর্ণ জেলায় জরুরি ভিত্তিতে টিকাদান ক্যাম্পেইন শুরু হয়েছে। ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী ১৮ মিলিয়ন শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সাক্ষায়ত হোসেন বলেছেন, "আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী ১০০ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনা হবে। আর অ্যান্টিবডি তৈরি হতে কিছু সময় লাগবে।"
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মুখপাত্র জাহিদ রাইয়ান বলেন, "এখন পর্যন্ত আমাদের লক্ষ্যমাত্রার এক-চতুর্থাংশের বেশি শিশুকে কাভার করতে পেরেছি। এই টিকাদান কর্মসূচির প্রভাব দেখতে আরও দুই সপ্তাহ সময় লাগবে।"
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশকে আরও আগেই সজাগ হতে হতো। এই রোগ প্রতিরোধে ন্যূনতম ৯৫ শতাংশ টিকাদানের প্রয়োজন, যা বর্তমানে অনেক কম। একক হামের রোগী ১৮ জন পর্যন্ত সুস্থ মানুষকে সংক্রমিত করতে পারে।
হাম শুধু প্রাণঘাতী নয়, বাঁচলেও শিশুর স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে। চিকিৎসকরা জানান, হামে আক্রান্ত শিশুরা অন্ধ ও বধির হতে পারে, ফুসফুস দুর্বল হয়ে যেতে পারে, এমনকি স্নায়বিক জটিলতাও দেখা দিতে পারে।
তথ্যসূত্র
১. স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাম সংক্রান্ত নিয়মিত প্রতিবেদন (এপ্রিল ২০২৬)
২. London Bangla - "100 dead as measles sweeps through Bangladesh"
৩. AFP - Sharjah 24 - "Bangladesh measles crisis deepens as child death toll reaches 194"
৪. Dhaka Stream - "Interim govt halted measles vaccine procurement"
৫. Arab News PK - "Bangladesh measles crisis deepens as child deaths reach 194"
৬. The Financial Express - "Two more patients die of measles"
৭. Accuweather/UPI - "Bangladesh begins vaccine push after 98 children died"
৮. News of Bahrain - "Vaccine gaps fuel Bangladesh's deadly measles crisis"
৯. The Financial Express - "Measles resurgence and cost of policy failures"
১০. ARN News Centre - "Fast-spreading measles outbreak has killed at least 30 in Bangladesh, WHO says"
মন্তব্য করুন