

বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য খাতের ইতিহাসে অন্যতম বড় বিপর্যয় নেমে এসেছে শিশুদের টিকাদান কর্মসূচিতে। নীতিনির্ধারকদের ‘হঠকারী’ ও ‘অদূরদর্শী’ সিদ্ধান্তের কারণে বর্তমানে দেশের অন্তত ৩০ লাখ শিশু ১১টি মারাত্মক রোগের ঝুঁকিতে রয়েছে। এক সময়ের সফল ‘সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি’ (ইপিআই) এখন নড়বড়ে অবস্থায়। এর প্রভাবে নির্মূল হওয়া হাম রোগ মহামারি আকারে ফিরে এসেছে এবং পোলিও, ধনুষ্টংকারসহ অন্যান্য প্রাণঘাতী রোগও এখন দরজায় কড়া নাড়ছে।
নীতিনির্ধারকদের ‘হঠকারী’ ও ‘অদূরদর্শী’ সিদ্ধান্তের কারণে বর্তমানে দেশের অন্তত ৩০ লাখ শিশু ১১টি মারাত্মক রোগের ঝুঁকিতে রয়েছে।
তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, এই বিপর্যয়ের পেছনে কোনো প্রাকৃতিক কারণ নয়, বরং স্বাস্থ্য খাতের প্রশাসনিক কাঠামোগত পরিবর্তনের নামে নেওয়া অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতাই দায়ী।
অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে ৩০ লাখ শিশু
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, গত চার-পাঁচ বছরে টিকা না পাওয়া অরক্ষিত শিশুর সংখ্যা বছরে জন্ম নেওয়া শিশুর সংখ্যার সমান বা তার বেশি হয়েছে। দেশে প্রতি বছর গড়ে ৩৪ লাখ শিশু জন্ম নেয়। সেই হিসেবে অন্তত ৩০ লাখ শিশু বর্তমানে টিকার আওতার বাইরে। হামের মতো অত্যন্ত সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব এই ঘাটতিরই স্পষ্ট প্রমাণ। চিকিৎসকদের মতে, একটি আক্রান্ত শিশু বাতাসের মাধ্যমে ১৭-১৮ জনকে সংক্রমিত করতে পারে। টিকাদানে এই ছন্দপতন শিশুদের পাশাপাশি পুরো দেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য এক অশনিসংকেত।
যেখানে ভুল ছিল নীতিনির্ধারণে
বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত প্রায় ২৬ বছর (১৯৯৮-২০২৪) ধরে সফলভাবে চলে আসা ‘অপারেশন প্ল্যান’ (ওপি) ভিত্তিক টিকা ক্রয় ও সরবরাহ ব্যবস্থা হঠাৎ করেই বন্ধ করে দেয় সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার। এর পরিবর্তে ‘ডিপিপি’ (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) ভিত্তিক জটিল ব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়া হয়।
২৬ বছর (১৯৯৮-২০২৪) ধরে সফলভাবে চলে আসা ‘অপারেশন প্ল্যান’ (ওপি) ভিত্তিক টিকা ক্রয় ও সরবরাহ ব্যবস্থা হঠাৎ করেই বন্ধ করে দেয় সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার। এর পরিবর্তে ‘ডিপিপি’ (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) ভিত্তিক জটিল ব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়া হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো ধরনের ‘এক্সিট প্ল্যান’ বা বিকল্প প্রস্তুতি ছাড়াই এই পরিবর্তন আনা হয়েছিল। ফলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সরবরাহ চেইন ভেঙে পড়ে। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর ও পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের সাপ্লাই চেইন পোর্টালে এখন ‘সব লাল’ সংকেত—যার অর্থ হলো, অতি প্রয়োজনীয় জীবন রক্ষাকারী ওষুধ ও টিকার মজুদ প্রায় শূন্য।
সতর্কবার্তা উপেক্ষা, ‘একনায়কতন্ত্রের’ প্রভাব
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ওপি বাতিলের আগেই স্বাস্থ্য বিভাগের বিভিন্ন অধিদপ্তর থেকে চরম বিপর্যয়ের আশঙ্কা জানিয়ে নীতিনির্ধারকদের বারবার সতর্ক করা হয়েছিল। গত ২০২৫ সালের ৬ মার্চ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, জনবলের বেতন বকেয়া থাকায় এবং অর্থ ছাড় না হওয়ায় সেবা ভেঙে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
কিন্তু তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. সায়েদুর রহমানের ‘একচেটিয়া’ ক্ষমতার কাছে সেই সতর্কবার্তাগুলো ধোপে টেকেনি। অভিযোগ রয়েছে, তিনি বৈঠকের অধিকাংশ সিদ্ধান্তে একক আধিপত্য বজায় রাখতেন এবং বিকল্প কাঠামো প্রস্তুত না করেই হঠকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণে চাপ সৃষ্টি করেছিলেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ‘ওয়ান ম্যান আর্মি’ টাইপ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ফলে পুরো স্বাস্থ্য খাত প্রশাসনিক স্থবিরতায় পড়ে যায়।
মাঠ পর্যায়ে সেবার করুণ দশা
টিকাদান কর্মসূচি কেবল টিকার অভাবে নয়, বরং জনবল সংকটেও ভুগছে। স্বাস্থ্য সহকারীদের বেতন বকেয়া এবং জ্বালানি খরচ না পাওয়ায় টিকাদান কার্যক্রম কার্যত থমকে আছে। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের হাজার হাজার কর্মী দীর্ঘসময় বেতন পাচ্ছেন না। ফলে টিকা থাকলেও কর্মী নেই, আবার কোথাও কর্মী থাকলেও টিকা নেই—এমন বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া এক বছরের বেশি সময় ধরে শিশুদের ভিটামিন-এ প্লাস ক্যাম্পেইন বন্ধ থাকায় অপুষ্টির ঝুঁকি আরও ঘনীভূত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ বলেন, “টিকার সংস্থান না থাকায় এই বিপুলসংখ্যক শিশু দীর্ঘ সময় ধরে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। যারা আক্রান্ত হচ্ছে, তাদের বেশির ভাগই হয় কোনো টিকা পায়নি অথবা দ্বিতীয় ডোজ সম্পন্ন করেনি।”
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের ফোকাল পারসন ডা. মনজুর আহমেদ একে ‘হঠকারী সিদ্ধান্ত’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, “সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট পোর্টালে ঢুকলে এখন সবকিছু ‘লাল’ হয়ে আছে। এই শূন্যতা কেবল সেবার ক্ষতি করছে না, বরং দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও মৃত্যুর মিছিলের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।”
জবাবদিহিতার অভাব
পুরো ঘটনায় স্বাস্থ্য খাতের নীতিনির্ধারকদের দায়বদ্ধতার অভাব প্রকট। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, তৎকালীন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম ও বিশেষ সহকারী ডা. সায়েদুর রহমান—কাউকেই এ বিষয়ে মন্তব্য করার জন্য পাওয়া যায়নি। কেউ অসুস্থতার দোহাই দিয়েছেন, কেউবা নীরব থেকেছেন।
স্বাস্থ্য খাতের বিশ্লেষকরা মনে করছেন, অবিলম্বে এই প্রশাসনিক অচলাবস্থা কাটিয়ে না উঠলে এবং টিকাদান কর্মসূচিকে পুনরায় ঢেলে না সাজালে, দেশ এক বড় ধরনের স্বাস্থ্য বিপর্যয়ের দিকে এগিয়ে যাবে। কেবল উন্নয়ন প্রকল্প বা নথিপত্র পরিবর্তনের মাধ্যমে নয়, বরং মাঠ পর্যায়ের প্রতিটি শিশুর কাছে টিকা পৌঁছানোর কার্যকর ব্যবস্থাপনাই এখন সময়ের দাবি।
মন্তব্য করুন