

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন তোলপাড় চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সই হওয়া বাণিজ্যচুক্তিটি জাতীয় সংসদে তোলার দাবিতে হাজার হাজার পোস্ট আসছে। বীর মুক্তিযোদ্ধা ও ডাকসুর সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাহবুব জামান তার ক্ষুদে বার্তায় প্রশ্ন তুলেছেন—‘জাতীয় সংসদে মার্কিন চুক্তি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে না কেন? অবিলম্বে চুক্তির অনুচ্ছেদ ৬.৫ কার্যকর করা হোক।’
এদিকে বুধবার সংসদে পয়েন্ট অব অর্ডারে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানাও একই দাবি জানান। তিনি বলেন, মঙ্গলবার মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রীর বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে আমদানি-রপ্তানির ঘাটতি, কৃষি ও জ্বালানিপণ্য আমদানির প্রতিশ্রুতি, ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়ন এবং বিনিয়োগ আকর্ষণে নীতি সংস্কারের বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়।
রুমিন ফারহানা আরও বলেন, ‘মার্কিন রাষ্ট্রদূত আরেকটি বিষয়ে আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করে বলেছেন, “দুই দেশের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে যে পরিমাণ পণ্য আমরা রপ্তানি করি, আমেরিকা থেকে সে পরিমাণ পণ্য আমরা আমদানি করি না; যে কারণে একটি বিরাট বাণিজ্যঘাটতি তৈরি হয়েছে এবং এই বাণিজ্যঘাটতি পূরণের লক্ষ্যেই বাণিজ্যচুক্তি হয়েছে।”’
তিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তিন দিন আগে এই চুক্তি সই হওয়ার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, তখন দেশের সুশীল সমাজ ও ‘থিঙ্কট্যাংক’ মহল থেকে বলা হয়েছিল, একটি অনির্বাচিত সরকার এ ধরনের চুক্তি সই করতে পারে না। এই চুক্তিতে অনেকগুলো ক্লজ আছে, যা বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী। দুর্ভাগ্যজনকভাবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তা শোনেনি এবং ৯ ফেব্রুয়ারি এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তিনি বলেন, ‘চুক্তিটির ৬০ দিনের মধ্যে যদি সরকার চায়, তবে তারা এটিকে বাতিল করতে পারে। চুক্তিটি সংসদে আনা হোক।’
চুক্তির ক্ষতিকর দিক: একটি গভীর বিশ্লেষণ
২০২৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে এই ‘পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি’ (Agreement on Reciprocal Trade-ART) স্বাক্ষরিত হয়। বিশ্লেষকরা এই চুক্তিকে ‘চরম বৈষম্যমূলক’, ‘স্বার্থবিরোধী’ এবং ‘বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের জন্য হানিকর’ আখ্যা দিয়েছেন।
১. ভাষাগত ও কাঠামোগত বৈষম্য
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ডিস্টিংগুইশড ফেলো অধ্যাপক ড. মুস্তাফিজুর রহমানের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, চুক্তির ৩২ পৃষ্ঠার মূল অংশে ‘বাংলাদেশ শল’ (Bangladesh shall—বাধ্যতামূলক) শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে ১৩১ বার! অথচ ‘যুক্তরাষ্ট্র শল’ (USA shall) ব্যবহার করা হয়েছে মাত্র ৬ বার। অন্যদিকে, ‘মে’ (may—ঐচ্ছিক) শব্দটি বাংলাদেশের জন্য ৫ বার এবং যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ৮ বার ব্যবহার করা হয়েছে। এটি চুক্তির ভাষায় স্পষ্টভাবে একটি অসম বাধ্যবাধকতা নির্দেশ করে, যা বাংলাদেশের দুর্বল দরকষাকষির অবস্থানকে তুলে ধরে।
২. রাজস্ব ক্ষতি
চুক্তির অধীনে, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর অবিলম্বে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিতে বাধ্য হচ্ছে:
৪,৯২২টি পণ্য অবিলম্বে শুল্কমুক্ত থাকবে।
আরও ২,২১০টি পণ্যের ওপর আগামী ৫-১০ বছরের মধ্যে শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হবে।
এই সুবিধার ফলে বাংলাদেশের জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বার্ষিক প্রায় ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ১২০০ কোটি টাকা) আয় হারাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি পণ্যের ওপর তাদের বিদ্যমান ১৫ শতাংশ এমএফএন (MFN) শুল্কের ওপর অতিরিক্ত ১৯ শতাংশ ‘পারস্পরিক শুল্ক’ (Reciprocal Tariff) আরোপ করবে, যা সর্বমোট ৩৪ শতাংশে গিয়ে দাঁড়াবে!
৩. বাধ্যতামূলক আমদানি প্রতিশ্রুতি: ‘এন্ডেভার’-এর ফাঁদ
চুক্তির একটি বিশেষ ধারা (অ্যানেক্স সেকশন ৬) বাংলাদেশকে নির্দিষ্ট পণ্য আমদানির ‘এন্ডেভার’ (প্রচেষ্টা) করতে বললেও, বিশেষজ্ঞরা একে একপ্রকার বাধ্যতামূলক প্রতিশ্রুতি হিসেবে দেখছেন।
| পণ্যের ধরন | পরিমাণ/মূল্য | সময়সীমা |
| গম | ৭০০,০০০ টন/বছর | ৫ বছর |
| সয়াবিন পণ্য | ১.২৫ বিলিয়ন ডলার/বছর (২.৬ মিলিয়ন টন) | বার্ষিক |
| এলএনজি (তরলীকৃত গ্যাস) | ১৫ বিলিয়ন ডলার | ১৫ বছর |
| বিমান (বোয়িং) | ১৪টি | চুক্তির মেয়াদকাল |
বর্তমানে বাংলাদেশ এই পণ্যগুলো অনেক কম মূল্যে আমদানি করে। বিশেষ করে, এলএনজি আমদানি বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি লক্ষ্যের পরিপন্থী এবং ব্যয়বহুল, যা দেশের জ্বালানি খাতে বড় চাপ সৃষ্টি করবে। অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সাথে এই বাণিজ্য চুক্তি আমাদের জ্বালানি সার্বভৌমত্বকে নষ্ট করছে। এই চুক্তি বলে দিচ্ছে আমরা কার কাছ থেকে তেল কিনতে পারব। এ জাতীয় সিদ্ধান্তের জন্য অনুমতি নেওয়া আমাদের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত।’
৪. ‘তুলা’ ক্লজ: অমীমাংসিত অনিশ্চয়তা
চুক্তির সবচেয়ে জটিল অংশ হলো ৫.৩ অনুচ্ছেদ। এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, শুধুমাত্র মার্কিন তুলা ও কৃত্রিম তন্তু (MMF) ব্যবহার করে তৈরি পোশাকের ওপর যুক্তরাষ্ট্র অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করবে না—কিন্তু তা ‘পরবর্তীতে নির্ধারিত পরিমাণ’ (to be specified volume) পণ্যের জন্য। অর্থাৎ, বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত পোশাকশিল্পের জন্য এই সুবিধা কতটুকু কার্যকর হবে, তা এখনো অনিশ্চিত। তাছাড়া, এই সুবিধা সরাসরি আমেরিকার তুলা শিল্পের জন্যই লাভজনক, বাংলাদেশি পোশাক রপ্তানিকারকের জন্য নয়। একজন রপ্তানিকারক মন্তব্য করেছেন, ‘প্রতি ডলার শুল্ক ছাড়ের বিপরীতে লাভটি সরাসরি আমেরিকার তুলা উৎপাদনকারীদের পকেটে চলে যাচ্ছে।’
৫. ভূ-রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা
এই চুক্তি শুধু বাণিজ্যিক নয়, গভীর ভূ-রাজনৈতিক শর্তও আরোপ করেছে। চুক্তির বিভিন্ন ধারা বাংলাদেশকে ‘অ-বাজার অর্থনীতির’ (non-market economy) দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক সীমিত করতে বাধ্য করে, যা পরোক্ষভাবে চীন ও রাশিয়াকে ইঙ্গিত করে। সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন মনে করেন, ‘এটি শুধু অর্থনৈতিক চুক্তি নয়, এটি ভূ-রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সংক্রান্তও। চুক্তিতে স্পষ্টভাবে বাংলাদেশকে কিছু দেশের সাথে সম্পর্ক সীমিত করার কথা বলা হয়েছে, যা ঢাকার কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার নীতির জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ।’
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট: যুক্তরাষ্ট্রের ‘চাপের কৌশল’ কি বিশ্বব্যাপী ব্যর্থ হচ্ছে?
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘পারস্পরিক শুল্ক’ আরোপের এই কৌশল বিশ্বব্যাপী ব্যাপক সমালোচিত হয়েছে। সম্প্রতি মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছে যে, জরুরি ক্ষমতা ব্যবহার করে ট্রাম্পের ঘোষিত এই ব্যাপক শুল্ক আরোপ আইনগতভাবে বৈধ ছিল না। এই রায়ের ফলে চুক্তির ভিত্তিই নড়বড়ে হয়ে গেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সুযোগে বাংলাদেশকে চুক্তিটি পুনর্মূল্যায়ন ও পুনরায় আলোচনার উদ্যোগ নিতে হবে।
মালয়েশিয়াসহ অনেক উন্নয়নশীল দেশ মার্কিন শুল্ক কমানোর এই ‘বাণিজ্য কূটনীতি’ সম্পর্কে সতর্ক। তারা দেখছে, সামান্য শুল্ক ছাড়ের বিনিময়ে দীর্ঘমেয়াদী আমদানি বাধ্যবাধকতা ও ভূ-রাজনৈতিক শর্ত মেনে নেওয়া তাদের জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী। সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেছেন, ‘এই চুক্তি বাংলাদেশকে ভবিষ্যতে অন্য কোনো দেশের সাথে বাণিজ্যচুক্তি করতে গেলে যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতি নিতে বাধ্য করছে, যা একটি দেশের স্বাধীন বাণিজ্য নীতির বিরোধী।’
দেশীয় প্রতিক্রিয়া: আন্দোলন ও প্রতিবাদ
বাংলাদেশের অভ্যন্তরে এই চুক্তির প্রতিবাদ ক্রমশ বাড়ছে:
বামপন্থী রাজনীতি: বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)সহ বামপন্থী জোট এই চুক্তিকে ‘আমেরিকার ঔপনিবেশিক কৌশল’ আখ্যা দিয়ে একাধিক সমাবেশ ও প্রতিবাদ মিছিল করেছে। তারা চুক্তি অবিলম্বে বাতিল এবং সংসদে এ বিষয়ে আলোচনার দাবি জানিয়েছে।
নাগরিক সমাজ: সুশীল সমাজের সংগঠনগুলো এই চুক্তির স্বচ্ছতার অভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ‘ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি’ আয়োজিত এক প্রাক-বাজেট সংসদীয় বিতর্কে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘এই চুক্তি আমাদের জ্বালানি, কৃষি ও বাণিজ্য সার্বভৌমত্ব কেড়ে নিচ্ছে। এটা আমাদের স্বাধীনতার ওপর হামলা।’
থিংক ট্যাংক: সিপিডি সবচেয়ে কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়ে সরকারকে চুক্তি বাতিলের পরামর্শ দিয়ে বিবৃতি দিয়েছে।
সোশ্যাল মিডিয়া আন্দোলন: সাধারণ নাগরিকরা ফেসবুক ও টুইটারে ‘#CancelUSTradeDeal’, ‘#ParliamentFirst’ ইত্যাদি হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। অনেকে এটাকে ‘অন্ধকারে করা চুক্তি’ (a deal done in the dark) হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ও করণীয়
বিশেষজ্ঞরা একমত যে, চুক্তিটি সই হয়ে গেলেও এটি কার্যকর হওয়ার আগে বাংলাদেশের কিছু করার সুযোগ আছে (অনুচ্ছেদ ৬.৫ অনুযায়ী ৬০ দিনের নোটিশে বাতিল)। সিপিডির বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক ড. মুস্তাফিজুর রহমান ‘রিভিউ অ্যান্ড রিভিজিট’ কৌশল নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, একটি অনির্বাচিত সরকার কেন দেশের জন্য এত বড় সিদ্ধান্ত নিতে গেল? নতুন সরকারের উচিত চুক্তিটি গুরুত্বের সাথে পর্যালোচনা করা এবং সম্ভব হলে পুনরায় আলোচনা শুরু করা।
এই প্রতিবেদন প্রস্তুত করা পর্যন্ত সরকার চুক্তিটি সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে উত্থাপনের কোনো উদ্যোগ নেয়নি। তবে ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে সরকার কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেদিকেই এখন সবার নজর।
মন্তব্য করুন