ঢাকা বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬, ৭ শ্রাবণ ১৪৩৩
মুক্ত ভাবনামুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

নগরায়ণের চাপ, পাল্টে যাচ্ছে খাদ্যাভ্যাস

রাস্তার খাবার আর রেস্তোরাঁর ভিড়ে বাড়ছে গ্যাস্ট্রিকের রোগী, ওষুধ বিক্রি ছাড়াল হাজার কোটি টাকা
সামিহা সামান্থা
প্রকাশ : ২১ জুলাই ২০২৬, ০৫:৩৯ পিএম
নগরায়ণের চাপ, পাল্টে যাচ্ছে খাদ্যাভ্যাস

শহরের প্রতিটি অলিগলিতে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠছে নতুন নতুন হোটেল-রেস্তোরাঁ আর ফুটপাতের দোকান। সহজলভ্য ও সস্তা হওয়ায় শহুরে মানুষ ক্রমেই ঝুঁকছেন এসব খাবারের দিকে। কিন্তু এর আড়ালে নীরবে বাড়ছে এক বড় স্বাস্থ্যসংকট—দেশের শীর্ষ ১০টি সর্বাধিক বিক্রিত ওষুধের পাঁচটিই এখন পাকস্থলীর সমস্যার! যার বার্ষিক বাজার ছাড়িয়ে যাচ্ছে হাজার কোটি টাকা। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এখনই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে এই সংকট সামনে আরও ঘনীভূত হবে।

দেশের নগরায়ণ যত দ্রুত এগোচ্ছে, ততই বদলে যাচ্ছে মানুষের খাদ্যাভ্যাস। কর্মজীবী মানুষের হাতে সময় কম, তাই বাড়ির রান্নার বদলে তাদের ভরসা হয়ে উঠছে পথের ধারের দোকান আর ছোট-বড় রেস্তোরাঁ। ঢাকা মেগাসিটিতে প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ মানুষের বসবাস; যাদের একটি বড় অংশ বস্তি ও নিম্ন আয়ের এলাকায় থাকেন এবং জীবিকার তাগিদে দিনের দীর্ঘ সময় বাড়ির বাইরে কাটান। ফলে চটপটি, ঝালমুড়ি, পিঁয়াজু, বেগুনি কিংবা শরবতের মতো দ্রুত পাওয়া যায় এমন খাবারই হয়ে উঠেছে তাদের নিত্যদিনের ভরসা। তবে নাগরিক সুবিধা বাড়লেও স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে পাল্লা দিয়ে।

অপরিচ্ছন্নতার উদ্বেগজনক চিত্র

দেশের বিভিন্ন রেস্তোরাঁ ও ফুটপাতের দোকান নিয়ে পরিচালিত একটি গবেষণায় উঠে এসেছে স্বাস্থ্যবিধির এক ভয়াবহ চিত্র। জরিপ করা ৬০০টি দোকানের মধ্যে মাত্র ৩২ শতাংশে হাত ধোয়ার জন্য পানি পাওয়া গেছে, আর সাবান ও পানি দুটোই ছিল মাত্র ১১ শতাংশ দোকানে। রেস্তোরাঁগুলোর খাবার তৈরির আগে কর্মীদের হাত ধোয়ার অভ্যাস দেখা গেছে মাত্র ৩ শতাংশ ক্ষেত্রে। আর জরিপে অংশ নেওয়া কোনো ফুটপাত বিক্রেতাকেই খাবার পরিবেশনের সময় সাবান দিয়ে হাত ধুতে দেখা যায়নি।

ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগৃহীত পথখাবারের নমুনা পরীক্ষায় মিলেছে আরও উদ্বেগজনক তথ্য—অধিকাংশ নমুনাতেই ই-কোলাই, সালমোনেলা ও স্ট্যাফাইলোকক্কাসের মতো ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

প্রতিদিন হাসপাতালে ছুটছেন শত শত মানুষ

আন্তর্জাতিক ডায়রিয়াজনিত রোগ গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি)-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন গড়ে অন্তত ৫০১ জন মানুষ ডায়রিয়া নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন, যার সঙ্গে খাদ্য নিরাপত্তার ঘাটতি সরাসরি জড়িত। একাধিক গবেষণার তথ্য বলছে, দূষিত খাবার খেয়ে প্রতিদিন দেশের প্রায় ছয় ভাগের একভাগ মানুষ কোনো না কোনোভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন।

ঢাকার বস্তি এলাকায় পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাইরে খাওয়া মানুষের প্রায় সবাই (৯৬ শতাংশ) খাবারের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত। গবেষণায় অংশ নেওয়া অনেকে জানিয়েছেন—বাসি খাবার, বারবার ব্যবহৃত তেলের গন্ধ আর খোলা অবস্থায় রাখা খাবারে মাছি বসার মতো বিষয়গুলো তাদের নিত্যদিনের অভিজ্ঞতা। তা সত্ত্বেও সময় ও অর্থের সীমাবদ্ধতার কারণে বাইরের খাবার এড়ানো তাদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।

চিকিৎসা সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশে ‘হেলিকোব্যাক্টর পাইলোরি’ ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ তুলনামূলক বেশি, যা গ্যাস্ট্রাইটিসসহ পাকস্থলীর নানা জটিলতার অন্যতম প্রধান কারণ। পেটে ব্যথা, বুক জ্বালাপোড়া, বদহজম, গ্যাস—এসব উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া মানুষের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে।

ওষুধ বিক্রিতে অভূতপূর্ব ঊর্ধ্বগতি

খাদ্য সংকটের সবচেয়ে স্পষ্ট প্রতিফলন মিলছে দেশের ওষুধ শিল্পে। সম্প্রতি প্রকাশিত আইকিউভিআই (IQVIA)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের শীর্ষ ১০টি সর্বাধিক বিক্রিত ওষুধের মধ্যে পাঁচটিই পাকস্থলীর চিকিৎসার অ্যান্টি-আলসারেন্ট (Anti-ulcerant)। এর মধ্যে শীর্ষে থাকা একটি ব্র্যান্ডের ওষুধই বছরের প্রথম নয় মাসে বিক্রি হয়েছে প্রায় ৯১৮ কোটি টাকার, যা দেশের মোট ওষুধ বাজারের প্রায় ২.৬৭ শতাংশ।

২০১৫ সাল থেকে দেশে অ্যান্টি-আলসার ওষুধের বিক্রি বার্ষিক ১২ শতাংশেরও বেশি হারে বাড়ছে। শীর্ষ তিনটি গ্যাস্ট্রিকের ওষুধের (সারজেল, ম্যাক্সপ্রো এবং প্যান্টোনিক্স) সম্মিলিত বার্ষিক বিক্রিই প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা ছুঁয়েছে। দেশে ২৬৫টির বেশি ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান থাকলেও শীর্ষ ১০টি প্রতিষ্ঠানের দখলে রয়েছে বাজারের প্রায় ৬৮ শতাংশ। সব মিলিয়ে দেশে গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ, ক্যাপসুল ও অ্যান্টাসিডের মোট বার্ষিক বিক্রি ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আইনি কাঠামো থাকলেও বাস্তবায়নে ঘাটতি

খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫ ও ১৮ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রের দায়িত্বের কথা স্পষ্ট বলা আছে। এছাড়া ২০১৩ সালের খাদ্য নিরাপত্তা আইনের অধীনে গঠিত হয়েছে 'বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ' (BFSA), আর মান নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে রয়েছে ‘বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন’ (BSTI)।

তবে গবেষকরা বলছেন, আইন থাকলেও তা বাস্তবায়নে বড় ঘাটতি রয়ে গেছে। বছরজুড়ে নিয়মিত বাজার তদারকির অভাব, লঘু জরিমানা এবং প্রান্তিক বিক্রেতাদের আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে পরিচ্ছন্নতার সরঞ্জাম কেনার সামর্থ্য না থাকা—এই কারণগুলো মিলেই খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনাকে দুর্বল করে রেখেছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।

সচেতনতাই এখন বড় সমাধান

বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল আইন প্রণয়ন কিংবা গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ বিক্রির ওপর নির্ভর করে এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। প্রয়োজন ভোক্তা পর্যায়ে ব্যাপক সচেতনতা, বিক্রেতাদের প্রশিক্ষণ এবং নিয়মিত বাজার মনিটরিং। গণমাধ্যম এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে—বিশেষত যেসব বিক্রেতা নিরক্ষর বা টেলিভিশন দেখার সুযোগ কম পান, তাদের কাছে সহজ ভাষায় খাদ্য নিরাপত্তার বার্তা পৌঁছানো জরুরি।

আশার কথা হলো, বিষয়টি নিয়ে গবেষণা ও আলোচনা বাড়ছে এবং নতুন প্রজন্মের মধ্যেও স্বাস্থ্যসচেতনতা তৈরি হচ্ছে। সরকার, গবেষক, গণমাধ্যম ও সাধারণ নাগরিক—সবাই মিলে সমন্বিত উদ্যোগ নিলে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা এবং গ্যাস্ট্রিকের মতো প্রতিরোধযোগ্য রোগের চাপ কমিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তথ্যসূত্র

Tamanna, I. M. (2024). Food adulteration and inadequate hygiene practices endangering public health in Bangladesh. Discover Food, Springer.

Haque, M. L., Oosterveer, P., Vignola, R., & Rasheed, S. (2023). Dealing with food safety concerns among urban poor when eating out: social practices in Dhaka, Bangladesh. Frontiers in Sustainable Food Systems.

Faisal, M. S. A. (2025). What gastric drug sales say about the state of our food safety. The Business Standard.

Doctor Service BD. Gastric Problems in Bangladesh: Causes, Symptoms, and Treatment.

আন্তর্জাতিক ডায়রিয়াজনিত রোগ গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (icddr,b)-এর তথ্য।

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

নগরায়ণের চাপ, পাল্টে যাচ্ছে খাদ্যাভ্যাস

মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির এক বছর / শোক, স্মৃতি আর বিচার পাওয়ার আকুতিতে কাটল বিষাদময় দিন

স্পেনের বিশ্বজয়, মেসির বিষাদ / ১৬ বছর পর আবার বিশ্বসেরা লা রোখারা

স্থানীয় সরকার নির্বাচন / পরিস্থিতি খারাপ হলে মাঠে থাকবে সেনাবাহিনী, বিধিমালা সংশোধনের উদ্যোগ ইসির

দুদকে ফাইলবন্দি ৮ হাজার অভিযোগ, পদের জন্য ৩২৭ আবেদন

শেখ হাসিনা ও আজিজসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন জমা

ভাঙছে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্য, অন্ধকারে প্রশাসন ও সওজ!

জুলাই অভ্যুত্থানের মামলায় নজিরবিহীন জালিয়াতি / জুলাই অভ্যুত্থানের ‘শহীদ’ সৌদি আরবে কর্মরত, অস্তিত্বহীন বাদীর ভুতুড়ে মামলা

ইরাক ছাড়ছে মার্কিন সেনা, অবসান ঘটছে দীর্ঘ ২৩ বছরের অধ্যায়ের

এমবাপ্পেদের ‘শ্বাস রোধ’ করে ফাইনালে স্পেন

১০

হামের উপসর্গে আরও ১ শিশুর মৃত্যু, মোট প্রাণহানি ৭৫৯

১১

মা-বাবার হাতে কিশোরী খুন, বস্তাবন্দী করে মোটরসাইকেলে লাশ সড়কে ফেলেন বাবা

১২

রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে চাঞ্চল্যকর দাবি / আইনি লড়াই করতেই ডিসেম্বরে দেশে ফিরছেন শেখ হাসিনা

১৩

চট্টগ্রামে অতিবৃষ্টি, ঢল ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা ৩০

১৪

মার্শাল আর্টের আড়ালে বোমার চর্চা: ‘গাজওয়াতুল হিন্দ’ এর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন সাবির

১৫

বগুড়ায় মিল মালিকের হাত-পা বেঁধে নৃসংশ হত্যাকাণ্ড, ট্রান্সফরমারের মালামাল লুট

১৬

সুপার টাইফুন ‘বাভি’র তাণ্ডব: লণ্ডভণ্ড মার্কিন দ্বীপপুঞ্জ রোটা ও গুয়াম

১৭

৮ কোটি টাকা বিতরণে পরামর্শক ও আমলাদের খরচ ৫৩ কোটি

১৮

পরকীয়ার অভিযোগে তরুণ ও গৃহবধূকে গাছে বেঁধে নির্যাতন, জোরপূর্বক বিয়ে

১৯

খাগড়াছড়িতে ৭ বছরের শিশুকে ধর্ষণের দায়ে শাহিনের মৃত্যুদণ্ড

২০