

কোনো পদ ছিল না, ছিল না নিয়োগের চূড়ান্ত বিজ্ঞপ্তি। সরকারি চাকরির নির্ধারিত বয়সসীমা অতিক্রম করা সত্ত্বেও কেবল ‘মানবিকতা’র দোহাই দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে স্থায়ী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ৩৬৫ জন কর্মচারীকে। দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে যাত্রা শুরু করা এসব কর্মকর্তা মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে তিন ধাপে পদোন্নতি পেয়ে পৌঁছে গেছেন প্রথম শ্রেণির পদে (সহকারী পরিচালক)। বর্তমানে আইন ও প্রবিধানমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তাঁরা ৬ষ্ঠ গ্রেডের ‘উপপরিচালক’ পদে উন্নীত হওয়ার অন্তিম প্রক্রিয়ায় রয়েছেন।
এখানেই শেষ নয়, ভবিষ্যতে নিয়োগ জালিয়াতির বিষয়টি তদন্তের মুখোমুখি হতে পারে—এমন আশঙ্কায় এসব কর্মকর্তা কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে ব্যাংকটিকেই এক প্রকার জিম্মি করে ফেলেছেন বলে জানা গেছে। দৈনিক কালবেলার অনুসন্ধান ও বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নথি বিশ্লেষণে এই নজিরবিহীন দুর্নীতির চিত্র উন্মোচিত হয়েছে।
‘মানবিক গভর্নরে’র আড়ালে জালিয়াতির সূচনা
নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০১০ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের মতিঝিলসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক কার্যালয়ে দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে ৩৬৬ জনকে ‘মুদ্রা/নোট পরীক্ষক (দ্বিতীয় মান)’ হিসেবে নেওয়া হয়। বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে আসা ছেঁড়া-ফাটা ও ময়লা নোট গণনার কাজের জন্য তাঁদের সাময়িক নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।
পরবর্তীতে তদানীন্তন গভর্নর ড. আতিউর রহমানের সময়ে ‘একান্ত মানবিক কারণ’ দেখিয়ে পরিচালনা পর্ষদের মাধ্যমে তাঁদের চাকরি স্থায়ী করা হয়। ২০১৪ সালে ৪টি ধাপে ২৩২ জন এবং ২০১৫ সালে অবশিষ্ট ১৩৩ জনকে স্থায়ী নিয়োগ দেওয়া হয়। এ কার্যাবলীর কারণে আতিউর রহমান এই কর্মকর্তাদের কাছে ‘মানবিক গভর্নর’ হিসেবে পরিচিতি পেলেও, সম্প্রতি ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর থেকে তিনি পলাতক। তদুপরি, রিজার্ভ চুরির মামলায় সিআইডির তদন্তাধীন রয়েছেন তিনি।
একই সভার বৈপরীত্য: প্রাথমিক নিয়োগ ‘অবৈধ’, কিন্তু চাকরি ‘স্থায়ী’
বাংলাদেশ ব্যাংকের ৩৬১তম পরিচালনা পর্ষদের সভার কার্যবিবরণী থেকে এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের চিত্র ফুটে ওঠে। ওই সভায় স্পষ্ট স্বীকার করা হয়— দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে নেওয়া এই কর্মচারীদের প্রাথমিক নিয়োগটি সরকারি কোটা ও আইন মেনে করা হয়নি, ফলে তা ছিল সম্পূর্ণ অবৈধ।
এ ঘটনার দায়ে তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত ৭ জন মহাব্যবস্থাপকের (জিএম) বিরুদ্ধে বিধিমোতাবেক আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেয় পর্ষদ। চিহ্নিত কর্মকর্তারা হলেন:
হাস্যকর বিষয় হলো, যে পরিচালনা পর্ষদ প্রারম্ভিক নিয়োগকে অবৈধ হিসেবে চিহ্নিত করে শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলল, সেই পর্ষদই একই বৈঠকে সেই অবৈধ নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মচারীদের চাকরি স্থায়ী করার অনুমোদন দিল!
শতভাগ পাসের নাটক ও কোটা বিধিমালার চরম লঙ্ঘন
চাকরি স্থায়ী করার লক্ষ্যে ২০১৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ‘বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট’ (বিআইবিএম)-এর মাধ্যমে এক বিশেষ লিখিত পরীক্ষা নেওয়া হয়। এতে অংশ নেন ৩৬৫ জন এবং অলৌকিক ও সন্দেহজনকভাবে পরীক্ষায় সবাই (১০০%) পাস করেন!
আইনজীবী মাহবুবে আলমের আইনগত মতামত এবং সরকারি সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের বিধি অনুযায়ী, কোটা বজায় রেখে ৩৬৫ জনকে নিয়োগ দিতে হলে কমপক্ষে ১২১৬টি পদ ও বিজ্ঞপ্তি থাকতে হতো। অথচ কোনো নিয়মিত শূন্যপদ ছাড়াই এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে রাজস্ব খাতে ঢোকানো হয়।
এছাড়া কোটার অভ্যন্তরীণ বণ্টনেও নেওয়া হয় ব্যাপক জালিয়াতির আশ্রয়। নিজস্ব নিয়মে বানানো হিসাবে:
ঢাকা: সর্বোচ্চ ২৫ জনের সুযোগ থাকলেও নিয়োগ পান ৩১ জন।
বগুড়া: ৮ জনের স্থলে ২৫ জন।
রাজশাহী: ৬ জনের স্থলে ২৮ জন।
খুলনা: ৬ জনের স্থলে ২৪ জন।
বরিশাল: ৬ জনের স্থলে ২০ জন।
জামালপুর: ৬ জনের স্থলে ১১ জন।
১০ বছর পার হয়ে গেলেও এই বিশাল কোটা ঘাটতির সামঞ্জস্য বিধান বা সমন্বয়ন আজ পর্যন্ত করা হয়নি।
মোটা অঙ্কের ঘুষ বাণিজ্য ও চাকরি পাওয়ার কৌশল
বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ একাধিক সূত্রের অভিযোগ, ২০১৪-১৫ সালের দিকে এসব কর্মচারীর নিয়োগ স্থায়ী করার প্রক্রিয়ায় ৩ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন বা ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠে। মূলত তদানীন্তন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের স্বজনদের অবৈধ উপায়ে স্থায়ী সুবিধার আওতায় আনতেই এসব কৌশল সাজানো হয়।
৫০০ কোটি টাকার ঋণে ব্যাংক জিম্মি
চাকরি স্থায়ী হওয়ার পরপরই অনিয়মের বিষয়টি ফাঁস হওয়া এবং ছাঁটাইয়ের ঝুঁকিতে পড়ার মানসিক আশঙ্কায় ভোগেন এই কর্মচারীরা। সেই আতঙ্ক থেকে মুক্ত হতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে কোটি কোটি টাকা ব্যাংক ঋণ গ্রহণ করেন তাঁরা।
সহকারী পরিচালক পদে উন্নীত হওয়ার পর প্রত্যেকে গৃহনির্মাণ ঋণ বাবদ প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ টাকা এবং গাড়ি কেনা বাবদ ৩০ লাখ টাকা ঋণ নেন। গড়ে জনপ্রতি ১ কোটি ৩৫ লাখ টাকা হিসাবে ৩৬৫ জনের নেওয়া ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৪৯২ কোটি ৭৫ লাখ টাকা (প্রায় ৫০০ কোটি টাকা)। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার মতে, “বিপুল পরিমাণ টাকা বকেয়া রেখে এখন ব্যাংক কর্তৃপক্ষ চাইলেও তাঁদের সহজে ছাঁটাই করতে পারছে না; পুরো ব্যাংককে তাঁরা একপ্রকার জিম্মি করে ফেলেছে।”
সংবিধান লঙ্ঘন ও মেধার অবমূল্যায়ন
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাহ নাভিলা কাশফির মতে, সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ (আইনের দৃষ্টিতে সমতা) ও ২৯ অনুচ্ছেদ (সরকারি নিয়োগে সুযোগের সমতা)-এর সরাসরি ব্যত্যয় ঘটেছে এই নিয়োগে।
সাধারণ উন্মুক্ত প্রতিযোগিতামূলক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ছাড়া ক্যাশ ক্যাডারের এমন পদ আঁকড়ে রাখার ফলে দেশের লক্ষাধিক মেধাবী শিক্ষার্থী ও ব্যাংকপ্রত্যাশী তরুণ চাকরি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। অযোগ্যদের প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা বানিয়ে পদোন্নতি প্রদান দেশের সামগ্রিক আর্থিক খাত ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানের স্থিতিশীলতাকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছে।
মন্তব্য করুন