

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI)-এর সম্ভাব্য মারাত্মক বিপর্যয় ও বিপদ নিয়ে আবারও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সতর্ক করেছেন মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস। অসৎ বা বিপজ্জনক ব্যক্তিদের হাতে এই সর্বাধুনিক প্রযুক্তি পৌঁছালে বিশ্বে নজিরবিহীন প্রাণহানি ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি।
মার্কিন গণমাধ্যম এনবিসি নিউজকে (NBC News) দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে বিল গেটস এই মন্তব্য করেন। সাক্ষাৎকারটি উদ্ধৃত করে ভারতীয় গণমাধ্যম 'এনডিটিভি' এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে।
সাক্ষাৎকারে বিল গেটস স্পষ্ট ভাষায় জানান, এআই-এর ঝুঁকিকে কোনোভাবেই হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, “সর্বাধুনিক এআই এমন মারাত্মক ঘটনা ঘটাতে সক্ষম, যার পরিণতিতে বিশ্বের অন্তত ১০০ কোটি (১ বিলিয়ন) মানুষের মৃত্যু হতে পারে। যদিও এমন ঘটনা ঘটার শতভাগ নিশ্চিত সম্ভাবনা গাণিতিকভাবে বলা কঠিন, তবে অসৎ উদ্দেশ্যসম্পন্ন মানুষের হাতে এআই প্রযুক্তির মতো শক্তিশালী কোনো অস্ত্র মানব ইতিহাসের আগে কখনো আসেনি।”
এআই-এর সীমাহীন ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে দ্রুত সরকারি ও আন্তর্জাতিক আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোকে আলোচনায় যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানান এই প্রবীণ প্রযুক্তিবিদ। গেটসের মতে, “এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা ও নজরদারি বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। এতে প্রযুক্তি খাতের ওপর কিছুটা অতিরিক্ত আইনি দায়বদ্ধতা চাপবে ঠিকই, কিন্তু এআই-এর সার্বিক উন্নয়নের গতি তাতে নাটকীয়ভাবে কমে যাবে না।”
সুপারইন্টেলিজেন্স ও বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ
বিল গেটসের এই সতর্কবার্তার ঠিক কয়েক দিন আগেই যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান অ্যালান টিউরিং ইনস্টিটিউট (Alan Turing Institute) এআই নিয়ে একটি উদ্বেগজনক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে এমন ‘সুপারইন্টেলিজেন্ট’ এআই ব্যবস্থা তৈরি হওয়ার বাস্তবসম্মত সম্ভাবনা রয়েছে, যা প্রায় সব ধরনের জটিল বুদ্ধিবৃত্তিক কাজে মানুষের সক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যাবে।
গবেষকরা সতর্ক করে বলেন, “এআই যদি এমন কৌশল অবলম্বন করতে শুরু করে যা মানুষ বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে তাৎক্ষণিকভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়, তবে এই প্রযুক্তির ওপর থেকে মানুষের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণরূপে হারিয়ে যেতে পারে।” এর ফলে রাসায়নিক ও জৈবিক অস্ত্রের সহজলভ্যতা বৃদ্ধি, গণতান্ত্রিক কাঠামোর বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট এবং বৈশ্বিক তথ্য সরবরাহ ব্যবস্থা ধসে পড়ার মারাত্মক ঝুঁকি রয়েছে।
অন্যান্য এআই বিশেষজ্ঞ ও প্রধানদের সতর্কতা
শুধু বিল গেটসই নন, এআই খাতের শীর্ষ নেতৃত্ব ও গবেষকরাও টানা একই ধরনের হুমকি নিয়ে কথা বলে আসছেন:
অ্যানথ্রপিক (Anthropic): প্রভাবশালী মার্কিন এআই প্রতিষ্ঠান ‘অ্যানথ্রপিক’-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (CEO) দারিও আমোদেই অতিসম্প্রতি ফ্রন্টিয়ার এআই (Frontier AI)-এর অতিদ্রুত উন্নয়নে সাময়িক বিরতি দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন। সেই সাথে চীনের সঙ্গে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা চুক্তি এবং তৃতীয় পক্ষের নিরপেক্ষ মূল্যায়নের জোর দাবি জানান।
জ্যাকব কক্সন ও ইভান হাবিঙ্গার: অ্যানথ্রপিকের সাবেক শীর্ষ গবেষক জ্যাকব কক্সন সতর্ক করে বলেছেন, চলতি দশকের (২০৩০ সালের) শেষ নাগাদ এআই-এর অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের কারণে মানবজাতি চরম অস্তিত্বসংকটে পড়তে পারে। অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানটির ‘অ্যালাইনমেন্ট সাইন্স’-এর প্রধান ইভান হাবিঙ্গার জানান, আগামী এক দশকের মধ্যে এআই-এর কারণে বিশ্বব্যাপী মানবিক বিপর্যয় ঘটার সম্ভাবনা ১০ শতাংশেরও বেশি।
বিশ্বজুড়ে এআই প্রযুক্তির জ্যামিতিক হারে বিকাশ যেমন নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করছে, ঠিক তেমনই একে সার্বজনীন ও কঠোর আইনি কাঠামোর আওতায় না আনলে তা মানবজাতির জন্য মারাত্মক হুমকির কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
মন্তব্য করুন