ঢাকা রবিবার, ১৫ মার্চ ২০২৬, ১ চৈত্র ১৪৩৩
মুক্ত মনমুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

১৪ মার্চ ১৯৭১: বঙ্গবন্ধুর হাতে বাংলার শাসনভার ও ঐতিহাসিক ৩৫ দফা

প্রিয়ভূমি প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৪ মার্চ ২০২৬, ০৫:৪৩ পিএম
১৪ মার্চ ১৯৭১: বঙ্গবন্ধুর হাতে বাংলার শাসনভার ও ঐতিহাসিক ৩৫ দফা

১৯৭১ সালের ১৪ মার্চ ছিল রোববার। এদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান সরকারের সমান্তরালে পূর্ব বাংলা পরিচালনার জন্য ৩৫ দফার এক ঐতিহাসিক প্রশাসনিক নির্দেশনা জারি করেন। এই নির্দেশনার মাধ্যমে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের শাসনভার কার্যত বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে এবং পাকিস্তানের সামরিক জান্তার কর্তৃত্ব কেবল সেনানিবাসগুলোর চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।

১. ৩৫ দফার ঐতিহাসিক নির্দেশনা ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ

বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগের পক্ষে তাজউদ্দীন আহমদ সরকারি কার্যক্রম পরিচালনার জন্য এই ৩৫টি নির্দেশনা প্রকাশ করেন। এশিয়াটিক সোসাইটি ও বিভিন্ন ঐতিহাসিকের মতে, এই নির্দেশনাবলি জারির পর পূর্ব পাকিস্তানের ওপর থেকে পশ্চিম পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ হাতছাড়া হয়ে যায়। নির্দেশনার প্রধান দিকগুলো ছিল:

কর ও খাজনা বন্ধ: কেন্দ্রীয় সরকারকে কোনো প্রকার ট্যাক্স বা খাজনা দেওয়া হবে না।

অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড: দেশের অভ্যন্তরে ব্যাংক, টেলিযোগাযোগ ও ডাক বিভাগ কেবল পূর্ব বাংলার প্রয়োজনে কাজ করবে। তবে পশ্চিম পাকিস্তানে কোনো অর্থ পাচার করা যাবে না।

জরুরি সেবা: সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমাতে বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি সরবরাহ, হাসপাতাল এবং গণমাধ্যমকে হরতালের আওতামুক্ত রাখা হয়।

শিক্ষা ও প্রশাসন: প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়। রেলওয়ে, সড়ক ও নদীপথ সচল রাখার নির্দেশ দেওয়া হয় দেশের অভ্যন্তরীণ সরবরাহ বজায় রাখার জন্য।

২. সামরিক ফরমান বনাম বাঙালির প্রতিরোধ

আগের দিন (১৩ মার্চ) পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খান একটি হুশিয়ারি জারি করেছিলেন। সেখানে প্রতিরক্ষা খাত থেকে বেতনভুক্ত কর্মচারীদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কাজে যোগ দিতে বলা হয়, অন্যথায় চাকরিচ্যুতি ও সামরিক আদালতে বিচারের হুমকি দেওয়া হয়। কিন্তু ১৪ মার্চ বাঙালি কর্মচারীরা এই নির্দেশ তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনার প্রতি অবিচল আনুগত্য প্রদর্শন করেন। প্রতিরক্ষা দপ্তরের বেসামরিক কর্মচারীরা ঢাকায় বিশাল প্রতিবাদ মিছিল বের করেন।

৩. রাজনৈতিক আলাপ-আলোচনা ও সমঝোতা প্রচেষ্টা

এদিন সকালে ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরের বাসভবনে ন্যাপ নেতা আবদুল ওয়ালী খানের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠকে মিলিত হন বঙ্গবন্ধু। বৈঠক শেষে বঙ্গবন্ধু সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে তাঁর বজ্রকণ্ঠ পুনরুক্তি করে বলেন:

“আমাদের সংগ্রাম স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক হিসেবে বেঁচে থাকার সংগ্রাম। জনগণের সার্বিক স্বাধীনতা অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত এই সংগ্রাম চলবে।”

৪. ভুট্টোর বিতর্কিত ‘দুই মেজরিটি’ ফর্মুলা

করাচির নিশতার পার্কে আয়োজিত এক জনসভায় পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভুট্টো এক অদ্ভুত ও বিভাজনমূলক প্রস্তাব পেশ করেন। তিনি দাবি করেন, ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হলে পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তানে দুটি সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের (আওয়ামী লীগ ও পিপিপি) কাছে পৃথকভাবে হস্তান্তর করা হোক। তাঁর এই ‘দুই অঞ্চলে দুই মেজরিটি’র ফর্মুলা মূলত পাকিস্তানকে ভাগ করারই নামান্তর ছিল।

৫. আতাউর রহমান খানের অস্থায়ী সরকার গঠনের আহ্বান

রাজনৈতিক পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে জাতীয় লীগ নেতা আতাউর রহমান খান প্রকাশ্যে বঙ্গবন্ধুকে একটি অস্থায়ী সরকার গঠনের আহ্বান জানান। এটি আন্দোলনের মোড়কে রাষ্ট্র গঠনের দিকে নিয়ে যাওয়ার এক জোরালো ইঙ্গিত ছিল।

৬. সংবাদপত্রের যৌথ প্রতিবাদ: ‘আর সময় নেই’

ঢাকার প্রধান দৈনিক পত্রিকাগুলো এদিন একটি বিরল ও সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করে। তারা একটি যৌথ সম্পাদকীয় প্রকাশ করে যার শিরোনাম ছিল— ‘আর সময় নেই’ (Time is Running Out)। এতে সামরিক জান্তাকে অবিলম্বে ক্ষমতা হস্তান্তরের মাধ্যমে রাজনৈতিক সমাধান খোঁজার চূড়ান্ত তাগিদ দেওয়া হয়।

৭. সম্পদ পাচার রোধে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ

ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ চেকপোস্ট বসায়। তাদের লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশ থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে সোনা, টাকা বা অন্য কোনো সম্পদ পাচার রোধ করা। পুরো চট্টগ্রাম শহর ‘জয় বাংলা’ ধ্বনিতে প্রকাল্পিত ছিল এবং সাধারণ মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ স্বাধীনতার সপক্ষে এক বিশাল জনমত তৈরি করে।

অধ্যাপক রেহমান সোবহানের ভাষায়, বাংলাদেশ কার্যত ৫ মার্চেই স্বাধীন হয়েছিল কারণ রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ বঙ্গবন্ধুর হাতে চলে এসেছিল। ১৪ মার্চের ৩৫ দফা নির্দেশনা সেই স্বাধীনতার প্রশাসনিক ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে। এটি ছিল প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের ঢাকা আসার ঠিক আগের দিন, যা প্রমাণ করে বাঙালি জাতি তখন পাকিস্তানি জান্তার কোনো আপস বা ধমকের তোয়াক্কা করছিল না।

তথ্যসূত্র

১. রবীন্দ্রনাথ ত্রিবেদী, ‘৭১ এর দশমাস’। ২. রামেন্দু মজুমদার, ‘বাংলাদেশ আমার বাংলাদেশ’। ৩. অধ্যাপক রেহমান সোবহান, ‘আনট্র্যাঙ্কুইল রিকালেকশন্স’। ৪. বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও ১৯৭১ সালে প্রকাশিত সংবাদপত্র (ইত্তেফাক, দৈনিক পাকিস্তান)।

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

১৪ মার্চ ১৯৭১: বঙ্গবন্ধুর হাতে বাংলার শাসনভার ও ঐতিহাসিক ৩৫ দফা

১৩ মার্চ ১৯৭১: জান্তার সামরিক ফরমান বনাম বাঙালির বজ্রশপথ

ইরান যুদ্ধে যোগ না দিলে সৌদিকে ‘পরিণতি’ ভোগের হুঁশিয়ারি মার্কিন সিনেটরের

শাহরিয়ার কবিরের মুক্তি চেয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর জরুরি আহ্বান

মুজতাবার প্রথম বার্তা / মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটি বন্ধের আলটিমেটাম, হরমুজ বন্ধ রাখার হুঁশিয়ারি

যুদ্ধাপরাধে দণ্ডিত সাতজনের জন্যও শোক জানাল ত্রয়োদশ সংসদ

রাশিয়ার তেল কিনতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ‘বিশেষ অনুমতি’ চাইল বাংলাদেশ

১২ মার্চ ১৯৭১: সুপ্ত আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ ও অবরুদ্ধ পাকিস্তান

১১ মার্চ ১৯৭১, অসহযোগ আন্দোলনের অনন্য উচ্চতায় আরোহণ

ইরান সংকট ও কিম জং-উনের রণকৌশল / পারমাণবিক অস্ত্রই কি সার্বভৌমত্বের একমাত্র রক্ষাকবচ?

১০

১০ মার্চ ১৯৭১: ঘরে ঘরে স্বাধীনতার নিশান ও চক্রান্তের কালো মেঘ

১১

৯ মার্চ ১৯৭১: উত্তাল জনসমুদ্র ও ভাসানীর ঐতিহাসিক ঘোষণা

১২

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে রেমিট্যান্স সংকটের শঙ্কা: প্রবাসীদের ফেরানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার

১৩

দ্বৈত বৈষম্যের অবসান চান সাঁওতাল নারীরা

১৪

টিআইবি’র চাঞ্চল্যকর অভিযোগ / অন্তর্বর্তী সরকারের তথ্য গায়েব করা হয়েছে

১৫

বিডার দেড় বছর: বিনিয়োগের জোয়ার নাকি প্রচারণার বেলুন?

১৬

২০টি কুকুর হত্যা: তিন আসামির কারাদণ্ড

১৭

৮ মার্চ ১৯৭১: বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে অচল রাজপথ, অসহযোগের দ্বিতীয় পর্যায়ে বাংলাদেশ

১৮

৭ই মার্চ: একটি ভাষণ, একটি জাতির জেগে ওঠা

১৯

প্রথম অধিবেশনে ভাষণ দেবেন রাষ্ট্রপতি

২০