ঢাকা সোমবার, ০৯ মার্চ ২০২৬, ২৫ ফাল্গুন ১৪৩২
মুক্ত মনমুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

৯ মার্চ ১৯৭১: উত্তাল জনসমুদ্র ও ভাসানীর ঐতিহাসিক ঘোষণা

প্রিয়ভূমি প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৯ মার্চ ২০২৬, ১২:২৯ পিএম
৯ মার্চ ১৯৭১: উত্তাল জনসমুদ্র ও ভাসানীর ঐতিহাসিক ঘোষণা

১৯৭১ সালের ৯ মার্চ ছিল অসহযোগ আন্দোলনের অষ্টম দিন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে দেশব্যাপী চলা এই আন্দোলনে পূর্ব পাকিস্তান তখন কার্যত পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন এক ভূখণ্ড। এদিন প্রশাসনিক ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে এবং রাজপথ দখলে নেয় মুক্তিকামী জনতা।

১. পল্টন ময়দানে ভাসানীর হুংকার ও বঙ্গবন্ধুর প্রতি সমর্থন

এদিনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ছিল ঢাকার পল্টন ময়দানে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) প্রধান মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর বিশাল জনসভা।

ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের ঘোষণা: ভাসানী বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের প্রতি পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করে বলেন, “মুজিবের নির্দেশমতো আগামী ২৫ তারিখের মধ্যে কোনো কিছু করা না হলে আমি মুজিবের সাথে মিলে ১৯৫২ সালের মতো তুমুল আন্দোলন শুরু করব।”

ইয়াহিয়াকে হুঁশিয়ারি: প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের উদ্দেশ্যে তিনি পবিত্র কোরআনের আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, “লা-কুম দ্বিনিকুম অলইয়া দ্বিন” (তোমার ধর্ম তোমার, আমার ধর্ম আমার)। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে তিক্ততা বাড়িয়ে লাভ নেই, পূর্ব বাংলার স্বাধীনতা মেনে নেওয়াই এখন একমাত্র পথ।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি: তিনি বাঙালি, বিহারি, হিন্দু ও মুসলমান—সকলের জানমাল রক্ষার আহ্বান জানিয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার ওপর জোর দেন।

২. প্রশাসনিক স্থবিরতা ও ‘বাংলার কসাই’ টিক্কা খান

বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে সরকারি ও আধা-সরকারি অফিস, হাই কোর্ট এবং জেলা আদালতসহ সর্বত্র সর্বাত্মক হরতাল পালিত হয়।

শপথ গ্রহণে অস্বীকৃতি: লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খানকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলেও ঢাকার হাই কোর্টের কোনো বিচারক তাকে শপথ বাক্য পাঠ করাতে রাজি হননি। ফলে সামরিক জান্তা এক প্রকার প্রশাসনিক পরাজয়ের সম্মুখীন হয়।

কালো পতাকা ও ব্যাজ: দেশজুড়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বাসভবনে কালো পতাকা উত্তোলন করা হয় এবং সর্বস্তরের মানুষ কালো ব্যাজ ধারণ করে প্রতিবাদ জানান।

৩. ছাত্রসমাজের ‘স্বাধীন বাংলাদেশ’ ঘোষণার প্রস্তাব

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের ক্যান্টিনে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সংসদের এক জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়।

প্রস্তাব অনুমোদন: সভায় ২ মার্চ গৃহীত ‘স্বাধীন বাংলাদেশ’ ঘোষণার প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন করা হয়।

জাতীয় সরকারের দাবি: ছাত্রলীগ ও ডাকসুর নেতারা অবিলম্বে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ‘জাতীয় সরকার’ গঠনের আহ্বান জানান।

৪. রাজশাহীতে কারফিউ ও চট্টগ্রামের সংঘর্ষ

সামরিক জান্তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে দমন-পীড়ন শুরু করে।

রাজশাহীতে সান্ধ্য আইন: ৯ মার্চ রাত ৯টা থেকে রাজশাহী শহরে অনির্দিষ্টকালের জন্য ৮ ঘণ্টার কারফিউ জারি করা হয়। আওয়ামী লীগ এই পদক্ষেপকে উসকানিমূলক আখ্যা দিয়ে অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি জানায়।

চট্টগ্রামে উত্তেজনা: চট্টগ্রামে অবাঙালিরা রেলওয়ে কলোনি ও এ কে খান রোডে বাঙালিদের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। বিকেলে তারা অস্ত্র হাতে মিছিল বের করে জনমনে ভীতি সৃষ্টির চেষ্টা করে।

৫. বিদেশি নাগরিকদের দেশত্যাগ ও আন্তর্জাতিক উদ্বেগ

পূর্ব বাংলার পরিস্থিতি বেগতিক দেখে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে।

জাতিসংঘের পদক্ষেপ: জাতিসংঘ মহাসচিব উ থান্ট ঢাকা থেকে জাতিসংঘের কর্মকর্তা ও তাদের পরিবারকে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেন।

বিদেশি নাগরিকদের প্রত্যাহার: জাপান, জার্মানি, ব্রিটেন, ফ্রান্স ও রাশিয়া তাদের নাগরিকদের দ্রুত ঢাকা ত্যাগের নির্দেশ দেয় এবং বিশেষ বিমানের ব্যবস্থা করে।

৬. বিভিন্ন সংগঠনের সংহতি

পিআইএ কর্মচারীদের মিছিল: তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্সের (পিআইএ) বাঙালি কর্মচারীরা মিছিল নিয়ে বঙ্গবন্ধুর ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর বাসভবনে গিয়ে সমর্থন জানান।

আর্থিক সহায়তা: ইস্টার্ন ব্যাংকিং করপোরেশনের কর্মচারীরা স্বাধিকার আন্দোলনের শহীদদের জন্য একদিনের বেতন আওয়ামী লীগের রিলিফ ফান্ডে দান করেন।

নাম পরিবর্তন: ‘ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস পাকিস্তান’-এর পরিবর্তে ‘বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস’ নামকরণের প্রস্তাব গৃহীত হয়।

৯ মার্চ ১৯৭১-এর ঘটনাবলি প্রমাণ করে যে, স্বাধীনতার দাবি কেবল একটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা মওলানা ভাসানীর মতো প্রবীণ জননেতা থেকে শুরু করে সাধারণ শ্রমিক-কর্মচারী পর্যন্ত সকলের দাবিতে পরিণত হয়েছিল। এদিন থেকেই পূর্ব বাংলার প্রশাসনিক চাবিকাঠি মূলত ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরের হাতে চলে আসে।

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

৯ মার্চ ১৯৭১: উত্তাল জনসমুদ্র ও ভাসানীর ঐতিহাসিক ঘোষণা

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে রেমিট্যান্স সংকটের শঙ্কা: প্রবাসীদের ফেরানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার

দ্বৈত বৈষম্যের অবসান চান সাঁওতাল নারীরা

টিআইবি’র চাঞ্চল্যকর অভিযোগ / অন্তর্বর্তী সরকারের তথ্য গায়েব করা হয়েছে

বিডার দেড় বছর: বিনিয়োগের জোয়ার নাকি প্রচারণার বেলুন?

২০টি কুকুর হত্যা: তিন আসামির কারাদণ্ড

৮ মার্চ ১৯৭১: বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে অচল রাজপথ, অসহযোগের দ্বিতীয় পর্যায়ে বাংলাদেশ

৭ই মার্চ: একটি ভাষণ, একটি জাতির জেগে ওঠা

প্রথম অধিবেশনে ভাষণ দেবেন রাষ্ট্রপতি

নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত? / রাষ্ট্রপতির কণ্ঠে ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’

১০

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ আর জিয়ার ছিয়াত্তরের ৭ মার্চ পালন—বিপরীত যাত্রা

১১

সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে উত্তরণের দর্শন

১২

পর্দার আড়ালের ইতিহাস / কেমন ছিল ৭ মার্চের ভাষণের পূর্বপ্রস্তুতি?

১৩

৭ মার্চের ভাষণ ছিল মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত দিকনির্দেশনা

১৪

৭ মার্চ ভাষণের বিশ্বজনীন তাৎপর্য

১৫

৭ মার্চ ১৯৭১: বাঙালির মহাকাব্য

১৬

৭ মার্চ থেকে শুরু হলো পাকিস্তানের পতন

১৭

৭ মার্চ ও শৃঙ্খলমুক্তির অবিনাশী আহ্বান

১৮

যুদ্ধের আগুনে পুড়ছে গার্মেন্টস কর্মীর স্বপ্ন ও আসন্ন বাজেট

১৯

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও বাংলাদেশের পোশাক খাত / অস্তিত্বের সংকটে ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’

২০