

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিনেই ইতিহাসের এক নজিরবিহীন ঘটনা ঘটেছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত জামায়াতে ইসলামীর ছয়জন নেতা ও বিএনপির একজন শীর্ষ নেতার নাম শোকপ্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের পর সংসদীয় রেওয়াজ অনুযায়ী উত্থাপিত এই শোকপ্রস্তাবে সংশোধনী এনে তাঁদের নাম যুক্ত করা হয় ।
শোকপ্রস্তাবে যুক্ত হওয়া সাত যুদ্ধাপরাধী
সংসদে শোকপ্রস্তাব উপস্থাপনের পর চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি এবং বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের প্রস্তাবে জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির মতিউর রহমান নিজামী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লা ও মুহাম্মদ কামারুজ্জামান এবং শুরা সদস্য মীর কাসেম আলীর নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পরবর্তীতে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বিএনপির সাবেক স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর নামও তালিকায় যুক্ত করেন ।
উল্লেখ্য, মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক সংগঠন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে এই সাতজনই মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন। এদের মধ্যে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী কারাগারে মৃত্যুবরণ করেন এবং বাকি ছয়জনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছিল ।
যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও দণ্ড
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে এই সাতজনের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধকালীন নির্দিষ্ট মানবতাবিরোধী অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় তাঁদের দণ্ড দেওয়া হয়। ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, তাঁরা গণহত্যা, হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ ও অপহরণের মতো গুরুতর অপরাধে সরাসরি জড়িত ছিলেন।
মতিউর রহমান নিজামী: জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির ও বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সাবেক মন্ত্রী। ১৯৭১ সালে আলবদর বাহিনীর প্রধান হিসেবে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডসহ একাধিক গণহত্যায় নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হয়। ২০১৬ সালের ১১ মে তাঁর ফাঁসি কার্যকর করা হয় ।
আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ: জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল ও বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সাবেক মন্ত্রী। বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগ প্রমাণিত হয়। ২০১৫ সালের ২২ নভেম্বর তাঁর ফাঁসি হয় ।
দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী: জামায়াতের নায়েবে আমির ও সাবেক সংসদ সদস্য। পিরোজপুরে অসংখ্য হত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাঁকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ২০২৩ সালের ১৪ আগস্ট কারাগারে তিনি মৃত্যুবরণ করেন ।
আব্দুল কাদের মোল্লা: জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল। মিরপুরে একাধিক হত্যা ও নির্যাতনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়, যা পরবর্তীতে আপিলে মৃত্যুদণ্ডে পরিণত হয়। ২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর তাঁর ফাঁসি কার্যকর করা হয়। তিনি "বীর প্রতীক" খেতাবধারী ।
মুহাম্মদ কামারুজ্জামান: জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল। মুক্তিযুদ্ধকালীন রাজশাহী অঞ্চলে হত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতনের অভিযোগ প্রমাণিত হয়। ২০১৫ সালের ১১ এপ্রিল তাঁর ফাঁসি হয় ।
মীর কাসেম আলী: জামায়াতের শুরা সদস্য ও অর্থায়নকারী। মুক্তিযুদ্ধকালীন হত্যা, অপহরণ ও নির্যাতনের অভিযোগ প্রমাণিত হয়। ২০১৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর তাঁর ফাঁসি কার্যকর করা হয় ।
সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী (সাকা চৌধুরী): বিএনপির সাবেক স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সংসদ সদস্য। চট্টগ্রামে মুক্তিযুদ্ধকালীন হত্যা, অপহরণ ও নির্যাতনের অভিযোগ প্রমাণিত হয়। ২০১৫ সালের ২২ নভেম্বর আপিল বিভাগের রায়ে তাঁর মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকে। পরবর্তীতে ২০১৬ সালের ২২ নভেম্বর তাঁর ফাঁসি কার্যকর করা হয়।
মন্তব্য করুন