ঢাকা বুধবার, ১১ মার্চ ২০২৬, ২৭ ফাল্গুন ১৪৩২
মুক্ত মনমুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

১১ মার্চ ১৯৭১, অসহযোগ আন্দোলনের অনন্য উচ্চতায় আরোহণ

প্রিয়ভূমি প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১১ মার্চ ২০২৬, ০২:৩৭ পিএম
১১ মার্চ ১৯৭১, অসহযোগ আন্দোলনের অনন্য উচ্চতায় আরোহণ

১৯৭১ সালের ১১ মার্চ ছিল বৃহস্পতিবার। অসহযোগ আন্দোলনের একাদশতম দিনে পূর্ব বাংলার সাধারণ মানুষের আত্মপ্রত্যয় ও বিদ্রোহ এক নতুন মাত্রায় পৌঁছায়। এদিন স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, ঢাকার মসনদ থেকে নয়, বরং ধানমন্ডির ৩২ নম্বর থেকেই শাসিত হচ্ছে এই জনপদ।

১. বেসামরিক প্রশাসনের পূর্ণ অসহযোগ ও পতাকা উত্তোলন

বঙ্গবন্ধুর আহবানে সাড়া দিয়ে এই দিনে পূর্ব বাংলার সিভিল প্রশাসন কার্যত অচল হয়ে পড়ে।

অফিস বর্জন: হাইকোর্টের বিচারপতি থেকে শুরু করে প্রশাসনের সচিব এবং সাধারণ কর্মচারী—সবাই একযোগে অফিস বর্জন করেন।

স্বাধীনতার নিশান: সচিবালয়, মুখ্য সচিবের বাসভবন এবং প্রধান বিচারপতির বাসভবনসহ প্রায় সব সরকারি-আধা সরকারি ভবনের শীর্ষে পাকিস্তানি পতাকার বদলে উড়তে থাকে স্বাধীন বাংলার মানচিত্র খচিত পতাকা।

একমাত্র ব্যতিক্রম: করাচিতে এয়ার মার্শাল (অব.) আসগর খান জানান যে, পুরো ঢাকায় কেবল সামরিক সদর দপ্তর ছাড়া আর কোথাও পাকিস্তানের পতাকা দেখা যাচ্ছে না।

২. অর্থনৈতিক অবরোধ ও ব্যাংকিং শিথিলতা আওয়ামী লীগের নির্দেশ অনুযায়ী খাজনা ও ট্যাক্স বন্ধ থাকায় পাকিস্তানি কেন্দ্রীয় সরকারের আর্থিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।

আঁতে ঘা: করাচি শিল্প ও বণিক সমিতির সভাপতি আহমদ আবদুল্লাহ প্রেসিডেন্ট ইয়াহইয়াকে জানান যে, পূর্ব বাংলা থেকে আর্থিক লেনদেন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পশ্চিম পাকিস্তানের ব্যবসায়ীরা চরম দুর্দশায় পড়েছেন।

সীমিত লেনদেন: সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমাতে বঙ্গবন্ধু দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ব্যাংক খোলা রাখার নির্দেশ দেন। তবে শর্ত ছিল, কোনো টাকা যেন পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিমে পাচার না হতে পারে।

৩. ভুট্টোর তারবার্তা ও আসগর খানের সতর্কতা

আন্দোলনের তীব্রতা দেখে পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভুট্টো উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।

সমঝোতার প্রস্তাব: ভুট্টো করাচি থেকে বঙ্গবন্ধুকে একটি তারবার্তা পাঠান। সেখানে তিনি ধ্বংস এড়াতে এবং "যেকোনো মূল্যের বিনিময়ে দেশকে রক্ষা" করতে সমঝোতার আহ্বান জানান।

বাস্তব চিত্র: অন্যদিকে আসগর খান করাচিতে এক সংবাদ সম্মেলনে স্পষ্টভাবে বলেন, শেখ মুজিবুর রহমানই এখন বাংলার প্রকৃত সরকার। সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করলে দেশকে এক রাখা অসম্ভব।

৪. সামরিক জান্তার হুমকি ও জনতা কর্তৃক রসদ আটক

পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী যখন শক্তি প্রয়োগের প্রস্তুতি নিচ্ছিল, বাঙালি জনতা তখন তাদের রসদ সরবরাহে বাধা দেয়।

১১৪নং আদেশ: রাতে সামরিক কর্তৃপক্ষ ১১৫নং সামরিক আদেশ জারি করে। এতে বলা হয়, সশস্ত্র বাহিনীর রক্ষণাবেক্ষণ বা গতিবিধিতে বাধা দেওয়া হলে তা আক্রমণাত্মক অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে এবং কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে।

রসদ সরবরাহ বন্ধ: সিলেটে এবং যশোরে সেনাবাহিনীর রেশন ও রসদবাহী কনভয়কে আটকে দেয় মুক্তিকামী জনতা।

৫. রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতা

ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাসভবন তখন কূটনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে পরিণত হয়।

গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক: ন্যাপ (ওয়ালী) নেতা অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ, পাঞ্জাব আওয়ামী লীগ সভাপতি এম খুরশীদ এবং কাউন্সিল মুসলিম লীগ প্রধান মমতাজ দৌলতানার বিশেষ দূত পীর সাইফুদ্দিন বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করেন।

জাতিসংঘের সাথে আলোচনা: জাতিসংঘের সহকারী আবাসিক প্রতিনিধি কে উলফ বঙ্গবন্ধুর সাথে বৈঠক করেন। বঙ্গবন্ধু তার কাছে পাকিস্তানি সামরিক সজ্জা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

৬. মওলানা ভাসানীর হুংকার ও সাংস্কৃতিক জাগরণ

ভাসানীর সংহতি: টাঙ্গাইলের বিন্দুবাসিনী হাইস্কুল মাঠে এক বিশাল জনসভায় মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানান। তিনি বলেন, "শেখ মুজিবুর রহমান সাত কোটি বাঙালির নেতা। তার নির্দেশ পালন করুন।"

সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ: চিত্রশিল্পী মুর্তজা বশীর সরকারি চিত্রপ্রদর্শনী বর্জন করেন। ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা আন্দোলনের সমর্থনে তাদের একদিনের বেতন আওয়ামী লীগের ত্রাণ তহবিলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

৭. কারাগারের অস্থিরতা

আন্দোলনের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে দেশের কারাগারগুলোতেও।

কুমিল্লা ও বরিশাল: কুমিল্লা কারাগারে পালানোর চেষ্টাকালে পুলিশের গুলিতে ৫ কয়েদি নিহত হয়। বরিশালেও একই ধরনের ঘটনায় ২৪ জন কয়েদি পালিয়ে যায় এবং পুলিশের গুলিতে ২ জন নিহত হন।

১১ মার্চ ১৯৭১ ছিল বাঙালির অবাধ্যতার এক চরম বহিঃপ্রকাশ। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম যেমন— দ্য টাইমস ও দ্য গার্ডিয়ান—এই বিদ্রোহকে 'অপ্রতিরোধ্য' হিসেবে বর্ণনা করে। বাঙালির ঐক্যবদ্ধ শক্তি সেদিন প্রমাণ করেছিল যে, কামানের গোলা দিয়ে আর এই জনপদকে দমন করা সম্ভব নয়।

তথ্যসূত্র

১. দৈনিক ইত্তেফাক আর্কাইভ।

২. রবীন্দ্রনাথ ত্রিবেদী, ‘৭১ এর দশমাস’।

৩. মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও বাংলাদেশ সরকারের তথ্য বাতায়ন।

৪. তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরি ও আওয়ামী লীগ ঐতিহাসিক নথিপত্র।

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

১১ মার্চ ১৯৭১, অসহযোগ আন্দোলনের অনন্য উচ্চতায় আরোহণ

ইরান সংকট ও কিম জং-উনের রণকৌশল / পারমাণবিক অস্ত্রই কি সার্বভৌমত্বের একমাত্র রক্ষাকবচ?

১০ মার্চ ১৯৭১: ঘরে ঘরে স্বাধীনতার নিশান ও চক্রান্তের কালো মেঘ

৯ মার্চ ১৯৭১: উত্তাল জনসমুদ্র ও ভাসানীর ঐতিহাসিক ঘোষণা

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে রেমিট্যান্স সংকটের শঙ্কা: প্রবাসীদের ফেরানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার

দ্বৈত বৈষম্যের অবসান চান সাঁওতাল নারীরা

টিআইবি’র চাঞ্চল্যকর অভিযোগ / অন্তর্বর্তী সরকারের তথ্য গায়েব করা হয়েছে

বিডার দেড় বছর: বিনিয়োগের জোয়ার নাকি প্রচারণার বেলুন?

২০টি কুকুর হত্যা: তিন আসামির কারাদণ্ড

৮ মার্চ ১৯৭১: বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে অচল রাজপথ, অসহযোগের দ্বিতীয় পর্যায়ে বাংলাদেশ

১০

৭ই মার্চ: একটি ভাষণ, একটি জাতির জেগে ওঠা

১১

প্রথম অধিবেশনে ভাষণ দেবেন রাষ্ট্রপতি

১২

নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত? / রাষ্ট্রপতির কণ্ঠে ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’

১৩

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ আর জিয়ার ছিয়াত্তরের ৭ মার্চ পালন—বিপরীত যাত্রা

১৪

সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে উত্তরণের দর্শন

১৫

পর্দার আড়ালের ইতিহাস / কেমন ছিল ৭ মার্চের ভাষণের পূর্বপ্রস্তুতি?

১৬

৭ মার্চের ভাষণ ছিল মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত দিকনির্দেশনা

১৭

৭ মার্চ ভাষণের বিশ্বজনীন তাৎপর্য

১৮

৭ মার্চ ১৯৭১: বাঙালির মহাকাব্য

১৯

৭ মার্চ থেকে শুরু হলো পাকিস্তানের পতন

২০