

টানা পাঁচ দিনের নজিরবিহীন বর্ষণ, উজান থেকে ধেয়ে আসা পাহাড়ি ঢল এবং একাধিক স্থানে আকস্মিক পাহাড় ধসের কারণে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় চট্টগ্রাম বিভাগের পাঁচ জেলায় এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় তৈরি হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রকাশিত সর্বশেষ পরিস্থিতি প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে এখন পর্যন্ত অঞ্চলটিতে ৩০ জন প্রাণ হারিয়েছেন। ৪৩ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের রেকর্ড ছোঁয়া এই মৌসুমি দুর্যোগে প্লাবিত হয়েছে মাইলের পর মাইল লোকালয়, ব্যাহত হচ্ছে সড়ক ও রেল যোগাযোগ।
জেলাভিত্তিক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র
মন্ত্রণালয়ের সংগৃহীত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দুর্যোগের সবচেয়ে বড় আঘাতটি এসেছে পর্যটন নগরী কক্সবাজারে। পাহাড়ি ঢালু অঞ্চলের অস্থায়ী বসতি ও রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলোতে মাটির দেয়াল ও পাহাড় ধসে এককভাবে ১৯ জনের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে।
এছাড়া অন্যান্য জেলাগুলোর সার্বিক চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:
চট্টগ্রাম ও বান্দরবান: এই দুই জেলায় ৫ জন করে মোট ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। আকস্মিক বন্যা এবং জঙ্গল সলিমপুরসহ বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকায় মাটি ধসে এই প্রাণহানি ঘটে।
রাঙ্গামাটি: পার্বত্য এই জেলায় এ পর্যন্ত ১ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে।
খাগড়াছড়ি: জেলাটিতে নিচু এলাকা ব্যাপকভাবে প্লাবিত হলেও এখন পর্যন্ত কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি।
আশ্রয়কেন্দ্রের বর্তমান অবস্থা
বিপন্ন মানুষদের তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা দিতে প্রশাসন পাঁচটি জেলা জুড়ে মোট ১,৪২৭টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রেখেছে। যদিও জেলাভেদে আশ্রয় নেওয়ার হারে ভিন্নতা দেখা গেছে:
| জেলা | প্রস্তুতকৃত আশ্রয়কেন্দ্র | বর্তমান আশ্রিত মানুষের সংখ্যা |
| চট্টগ্রাম | ৪১১টি | ৮,৩৪০ জন |
| বান্দরবান | ২২০টি | ২১৭৩ জন |
| খাগড়াছড়ি | ১৩৫টি | ১,৭৫৫ জন |
| রাঙ্গামাটি | ২১টি | ১,২০৬ জন |
| কক্সবাজার | ৬৪০টি | ০ জন (কোনো আশ্রিত নেই) |
কক্সবাজারে রেকর্ডসংখ্যক আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হলেও সেখানে বর্তমানে কোনো মানুষ অবস্থান করছে না, যা স্থানীয়দের নিজেদের ভিটেমাটিতে থাকার প্রবণতা অথবা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জোরপূর্বক স্থানান্তরের অভাবকে নির্দেশ করে।
সরকারি তৎপরতা ও আর্থিক বরাদ্দের বিবরণ
ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোর স্থানীয় প্রশাসনকে পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারের পক্ষ থেকে দুই দফায় (৭ জুলাই এবং ৯ জুলাই) বিশেষ জরুরি তহবিল ও খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
প্রথম দফা (৭ জুলাই)
সবকটি দুর্গত জেলাকে (চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান) সমানভাবে পুনর্বাসন ও সহায়তার জন্য নগদ ১০ লাখ টাকা এবং ২০০ মেট্রিক টন চাল করে মোট ৫০ লাখ টাকা ও ১,০০০ মেট্রিক টন চাল দেওয়া হয়।
দ্বিতীয় দফা (৯ জুলাই)
পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় শিশুদের বিশেষ খাদ্য নিশ্চিত করতে এবং সাধারণ সাহায্য বাড়াতে ভিন্ন ভিন্ন অঙ্কের বরাদ্দ দেওয়া হয়:
চট্টগ্রাম: শিশুদের জন্য ২৫ লাখ টাকা নগদ এবং ৩০০ মেট্রিক টন চাল।
কক্সবাজার: শিশুদের জন্য ২০ লাখ টাকা নগদ এবং ২৫০ মেট্রিক টন চাল।
তিন পার্বত্য জেলা (রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান): প্রতি জেলায় শিশুদের জন্য ১০ লাখ টাকা নগদ এবং ২০০ মেট্রিক টন করে চাল দেওয়া হয়েছে।
সর্বমোট দুই দফায় নগদ ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা এবং ২,১৫০ মেট্রিক টন চাল মাঠপর্যায়ে সরবরাহ করা হয়েছে।
মাঠপর্যায়ের বর্তমান পরিস্থিতি ও উদ্ধার অভিযান
সাগর উত্তাল থাকায় সৃষ্ট লঘুচাপ এবং সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড, সাতকানিয়া, ফটিকছড়ি এবং বান্দরবান-রোয়াংছড়ি সড়কের বিস্তীর্ণ এলাকা এখন পানির নিচে। অনেক স্থানে রেললাইন ও সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থবির হয়ে পড়েছে।
ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নিতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত সচেতনতামূলক মাইকিং চালানো হচ্ছে। এছাড়া বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রিত বন্যার্তদের জন্য তিন বেলা রান্না করা খাবার সরবরাহ, নিরাপদ স্যানিটেশন নিশ্চিতকরণ এবং বিশুদ্ধ সুপেয় পানির ব্যবস্থা করার জন্য কাজ করছে স্থানীয় প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবক দল।
মন্তব্য করুন