ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬, ২৫ আষাঢ় ১৪৩৩
মুক্ত ভাবনামুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

মার্শাল আর্টের আড়ালে বোমার চর্চা: ‘গাজওয়াতুল হিন্দ’ এর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন সাবির

প্রিয়ভূমি প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৯ জুলাই ২০২৬, ০৫:১৭ পিএম
যাত্রাবাড়ীর ‘মিনি কক্সবাজার’ এলাকা থেকে পুলিশ ‘ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেম’- এর ছয়জনকে আটক করে | ছবি: সংগৃহীত

মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষণের আড়ালে উগ্রবাদী আদর্শের বিস্তার ও তথাকথিত ‘গাজওয়াতুল হিন্দ’ বা ভারতীয় উপমহাদেশের চূড়ান্ত যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়ার অভিযোগে সম্প্রতি রাজধানী ঢাকার যাত্রাবাড়ী থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ছয় তরুণকে। আপাতদৃষ্টিতে একটি আত্মরক্ষা কৌশল শেখার কেন্দ্র মনে হলেও, ‘ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেম’ (এফসিএস) নামের এই সংগঠনের অভ্যন্তরে চলছিল ভিন্ন এক তৎপরতা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের ধারাবাহিক জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য।

গ্রেপ্তারের পটভূমি ও আইনি প্রক্রিয়া

বিগত রোববার ভোর সাড়ে ৬টার দিকে যাত্রাবাড়ীর ‘মিনি কক্সবাজার’ এলাকা থেকে পুলিশ এই ছয়জনকে আটক করে। ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালত থেকে প্রথম দফায় তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়।

তদন্তকারী কর্মকর্তাদের দাবি—সংগঠনের মূল চালিকাশক্তি শাহ আমানত সাবির উগ্রবাদে সম্পূর্ণভাবে জড়িয়ে পড়েছেন। তবে তার প্রধান সহযোগী হোসাইন তানিম এবং বাকি চার সদস্যের (জুনায়েদ, আতাউল্লাহ শাহ, আবিদুর রহমান ও বায়োজিদ) এই আদর্শিক জগতে গভীর কোনো সম্পৃক্ততা এখনো মেলেনি। মূলত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মার্শাল আর্টের বিজ্ঞাপন দেখে তারা সাবিরের কাছে এসেছিলেন। ফলশ্রুতিতে, আদালত সাবির ও তানিমকে দ্বিতীয় দফায় আরও তিন দিনের রিমান্ডে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে এবং বাকি চারজনকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

শাহ আমানত সাবির

বোমা বিস্ফোরণের ভিডিও ও সামাজিক মাধ্যমে তোলপাড়

গ্রেপ্তারের পর এই তরুণদের মুক্তির দাবিতে যখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ডানপন্থি ও ধর্মীয় ঘরানার অ্যাক্টিভিস্টরা সোচ্চার হচ্ছিলেন, ঠিক তখনই একটি ভিডিও পুরো দৃশ্যপট বদলে দেয়। প্রবাসী সাংবাদিক জুলকারনাইন শায়ের সামির পোস্ট করা ১ মিনিট ৪ সেকেন্ডের একটি ভিডিওতে দেখা যায়:

  • সাবির ও তার সহযোগীরা একটি নির্জন গ্রামীণ সড়কে একটি বিস্ফোরণ ঘটাচ্ছেন।
  • পটভূমি বা ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজছিল আন্তর্জাতিক জঙ্গি গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের (আইএস) একটি জিহাদি নাশিদ।
  • বিস্ফোরণের পর ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি দিয়ে দা উঁচিয়ে সাবিরকে বলতে শোনা যায়, “হে কুফররা তোমরা তৈরি থাকো। দ্রুতই আমরা তোমাদের ওপর বজ্রের মতো আঘাতের জন্য প্রস্তুতি…। ইউনূস তুই তৈরি থাক।”

সিটিটিসি-র রাসায়নিক ব্যাখ্যা

যদিও সামাজিক মাধ্যমে একে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন 'আইইডি' (ইমপ্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস) বলে দাবি করা হয়েছিল, তবে সিটিটিসি-র তদন্তে ভিন্ন তথ্য এসেছে। এটি মূলত ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর খুলনার ডুমুরিয়ায় ঘটানো একটি বিস্ফোরণ। সাধারণ চকলেট বোমার উপাদানের সাথে পেট্রোল ও অন্য একটি রাসায়নিক মিশিয়ে তারা এটি তৈরি করেছিল। আলো ও আগুনের ঝলকানি থাকলেও এতে তেমন কোনো তীব্র শব্দ ছিল না। পরবর্তীতে সাবির ও তার দল ভিডিওটি ডিজিটাল প্রযুক্তির সাহায্যে এডিট করে ভারী বিস্ফোরণের ‘বুম’ শব্দ যুক্ত করে, যাতে নিজেদের সক্ষমতা বড় করে জাহির করা যায়।

অর্থায়ন ও ‘ম্যাক ইউরি’ রহস্য

একটি উগ্রবাদী চিন্তাধারা বাস্তবায়নে শক্তির পাশাপাশি প্রয়োজন কৌশল ও অর্থ। জিজ্ঞাসাবাদে সাবির স্বীকার করেছেন যে, তাদের প্রধান প্রশিক্ষক ছিলেন ‘ম্যাক ইউরি’ নামের এক রহস্যময় ব্যক্তি (যা সম্ভবত একটি ছদ্মনাম)। এই ‘ম্যাক ইউরি’র কাছ থেকেই সাবির যুদ্ধের কৌশল ও কমব্যাট ট্রেনিং নেন এবং পরবর্তীতে খুলনায় নিজের একাডেমি খোলেন।

সংগঠন পরিচালনার জন্য তহবিল সংগ্রহের ক্ষেত্রে তারা এক অদ্ভুত ও বিতর্কিত দর্শনের আশ্রয় নেন। যশোরে অমুসলিমদের স্বর্ণের দোকানে বড় ধরনের ডাকাতির গুঞ্জন থাকলেও পুলিশ তার সত্যতা পায়নি। তবে সাবির স্বীকার করেছেন যে, খুলনায় এক সনাতন ধর্মাবলম্বী ইজিবাইক চালককে তারা ‘বিধর্মী’ ও ‘হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের সদস্য’ হিসেবে চিহ্নিত করে তার টাকা-পয়সা ছিনতাই করেন। তাদের উগ্রপন্থী মগজধোলাই এমন পর্যায়ে ছিল যে, অমুসলিমদের ওপর এই অপরাধকে তারা কোনো ‘জুলুম’ বা পাপ বলে গণ্য করেননি, বরং সংগঠন চালানোর বৈধ উৎস হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন।

ধর্মীয় বক্তাদের অবস্থান পরিবর্তন ও ‘চর’ বিতর্ক

সাবির ও তার দল গ্রেপ্তার হওয়ার পর প্রখ্যাত ধর্মীয় বক্তা আতাউর রহমান বিক্রমপুরী এবং আসিফ আদনান সামাজিক মাধ্যমে তাদের মুক্তির দাবিতে জোরালো বক্তব্য দিয়েছিলেন। সাবির নিয়মিত আতাউর রহমান বিক্রমপুরীর সাথে যোগাযোগ রাখতেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে তার পরামর্শ নিতেন বলেও তদন্তে জানা গেছে।

তবে বোমা বিস্ফোরণের ভিডিওটি জনসমক্ষে আসার পর এই ধর্মীয় গুরু ও ডানপন্থি বলয়ে তীব্র অস্বস্তি তৈরি হয়। অনেকেই দ্রুত নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করেন:

  • আসিফ আদনান তার পোস্ট মুছে দিয়ে জানান, ভুল তথ্যের ভিত্তিতে এবং অতীতে পুলিশের কিছু বিতর্কিত ভূমিকার কথা মাথায় রেখে তিনি প্রথমে পোস্ট দিয়েছিলেন। পরে নির্ভরযোগ্য সূত্রে সত্যতা জেনে তিনি পিছু হটেন।
  • আতাউর রহমান বিক্রমপুরী স্পষ্ট ভাষায় জানান যে, ভিডিওটি বাস্তব এবং সাবির ১৯০৮ সালের বিস্ফোরক আইনের অধীনে মারাত্মক অপরাধ করেছেন।

সবচেয়ে নাটকীয় মোড় নেয় যখন সাবিরের শ্বশুর আতিয়ার রহমান সামাজিক মাধ্যমে বিক্রমপুরীর পোস্টে মন্তব্য করেন যে, ‘কাফেরদের সহযোগিতা করা ঈমান ভঙ্গের কারণ’। এর জবাবে বিক্রমপুরী উল্টো প্রশ্ন তোলেন—“আপনার মেয়ে জামাই সাবির মুসলিম, নাকি ‘র’ (ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা) এর এজেন্ট—সেটা আগে পরিষ্কার করুন। সে নিজে প্রতারণা করে নিজের কর্মকাণ্ড গোপন রেখে পরামর্শ নিয়েছে।”

এই ঘটনার পর ডানপন্থি আন্দোলনের ভেতরেই এখন সন্দেহ দানা বাঁধছে যে, সাবির আসলেই কোনো উগ্রপন্থী, নাকি ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোকে বিপদে ফেলতে কোনো বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থার ‘প্ল্যান্টেড এজেন্ট’ বা চর হিসেবে কাজ করছিলেন।

ভবিষ্যৎ তদন্তের অভিমুখ

ডিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ শামসুল হক জানিয়েছেন, মামলাটির পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত চলছে। কোনো আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের সাথে সুনির্দিষ্ট সংযোগ এখনো না মিললেও, দেশীয় কোনো সুপ্ত চক্র বা কোনো অদৃশ্য শক্তির ইন্ধনে তরুণদের এই দল উগ্রবাদের পথে পা বাড়িয়েছে কিনা, তা পরবর্তী রিমান্ডের জিজ্ঞাসাবাদে আরও পরিষ্কার হবে।

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

চট্টগ্রামে অতিবৃষ্টি, ঢল ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা ৩০

মার্শাল আর্টের আড়ালে বোমার চর্চা: ‘গাজওয়াতুল হিন্দ’ এর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন সাবির

বগুড়ায় মিল মালিকের হাত-পা বেঁধে নৃসংশ হত্যাকাণ্ড, ট্রান্সফরমারের মালামাল লুট

সুপার টাইফুন ‘বাভি’র তাণ্ডব: লণ্ডভণ্ড মার্কিন দ্বীপপুঞ্জ রোটা ও গুয়াম

৮ কোটি টাকা বিতরণে পরামর্শক ও আমলাদের খরচ ৫৩ কোটি

পরকীয়ার অভিযোগে তরুণ ও গৃহবধূকে গাছে বেঁধে নির্যাতন, জোরপূর্বক বিয়ে

খাগড়াছড়িতে ৭ বছরের শিশুকে ধর্ষণের দায়ে শাহিনের মৃত্যুদণ্ড

জামালপুরে গৃহবধূকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের দায়ে ৭ জনের মৃত্যুদণ্ড

খাগড়াছড়িতে দুই পক্ষের আধিপত্য বিস্তারের জেরে গোলাগুলি, নিহত ৩

৬ জুলাই ১৯৭১: মুক্তাঞ্চলে জনপ্রতিনিধিদের শপথ, পাকিস্তানের মিথ্যাচার ও কিসিঞ্জারের অবরুদ্ধ যাত্রা

১০

নিভিয়ে দেয়া হয়েছে ‘শিখা অনির্বাণ’

১১

হোলি আর্টিজান হামলার এক দশক: ট্র্যাজেডি, বিচারপ্রক্রিয়া এবং বর্তমান নিরাপত্তা সমীক্ষা

১২

জাপানের জমাট রক্ষণ চূর্ণ করে ব্রাজিলের উল্লাস

১৩

৭ শিল্প অঞ্চলে ৪৫৭ কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ, বিপাকে তৈরি পোশাক খাত

১৪

বোবা কান্নার মেঘনা ও আমাদের মরে যাওয়া মনুষ্যত্ব

১৫

একের পর এক ‘মিথ্যা’ মামলা, আদালতে ক্ষোভ প্রকাশ করলেন মিষ্টি সুবাস

১৬

ভেনেজুয়েলায় জোড়া ভূমিকম্প: আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জরুরি সহায়তা চাইল জাতিসংঘ

১৭

তিন মেয়েসহ মাকে কুপিয়ে হত্যা, গণপিটুনিতে ঘাতক নিহত

১৮

ভেনেজুয়েলায় ১২৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্প

১৯

২৩ জুন ১৯৭১: আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে তোলপাড় এবং প্রতিরোধ যুদ্ধের উত্তাল দিন

২০