ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬, ৮ বৈশাখ ১৪৩৩
মুক্ত মনমুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা
পর্দার আড়ালের ইতিহাস

কেমন ছিল ৭ মার্চের ভাষণের পূর্বপ্রস্তুতি?

প্রিয়ভূমি প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৭ মার্চ ২০২৬, ০২:৪১ এএম
কেমন ছিল ৭ মার্চের ভাষণের পূর্বপ্রস্তুতি?

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের কালজয়ী ভাষণ আজ কেবল বাঙালির সম্পদ নয়, এটি ইউনেস্কো স্বীকৃত বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য। ১২টি ভাষায় অনূদিত এই ভাষণটিকে বলা হয় বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রথম ডাক। তবে এই মহাকাব্যিক ভাষণের পেছনে ছিল টানটান উত্তেজনা, গভীর প্রজ্ঞা এবং সুনিপুণ কৌশল। ইতিহাসের পাতা থেকে জানা যায় সেই দিনের ভাষণের পূর্বপ্রস্তুতির অজানা সব তথ্য।

উত্তাল মার্চের প্রেক্ষাপট

১৯৭১ সালের ২ মার্চ ঢাকা এবং ৩ মার্চ সারাদেশে হরতাল পালিত হয়। ৩ মার্চ পল্টন ময়দানে বঙ্গবন্ধু অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন এবং ঘোষণা করেন যে, ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে তিনি পরবর্তী কর্মসূচি জানাবেন। জনসভার দিন যত ঘনিয়ে আসছিল, ছাত্রনেতাদের পক্ষ থেকে সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণার চাপ তত বাড়ছিল। তবে বঙ্গবন্ধু ছিলেন ধীরস্থির। এক তরুণ নেতা সরাসরি ঘোষণার দাবি তুললে বঙ্গবন্ধু খানিকটা অসন্তষ্ট হয়ে বলেছিলেন, “আমি মানুষের নেতৃত্ব দেব, তারা দেবে না। তোমরা তোমাদের কাজে যাও।”

নীতিনির্ধারণী আলোচনা ও ছয় দফার শর্ত

৬ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধু জাতীয় চার নেতাসহ দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেন। সেখানে চারটি মূল বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়: সামরিক শাসন প্রত্যাহার, সৈন্যদের ব্যারাকে ফিরিয়ে নেওয়া, গণহত্যার তদন্ত এবং জনপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর। বঙ্গবন্ধু আলোচনার পথ খোলা রেখেও প্রতিরোধের ছক কষছিলেন।

বেগম মুজিবের সেই অমোঘ পরামর্শ

৭ মার্চের আগের রাতে বঙ্গবন্ধু ছিলেন বেশ চিন্তিত। কখনো পাইপ হাতে পায়চারি করেছেন, কখনো মনের ভাবনাগুলো লিখেছেন। তবে ভাষণটি কোনো লিখিত পাণ্ডুলিপি ছিল না। বঙ্গবন্ধুর স্ত্রী ফজিলাতুন্নেছা মুজিব তাঁর দ্বিধা দেখে বলেছিলেন, “অনেকেই অনেক কথা বলবে। তুমি সারাজীবন আন্দোলন-সংগ্রাম করেছ, জেল খেটেছ। তুমি জানো কী বলতে হবে, মানুষ কী শুনতে চায়। তোমার মনে যে কথা আসবে, সে কথাই বলবা। তুমি নিজে যা বিশ্বাস করো, তাই বলবে।”

রেসকোর্সে মৃত্যুফাঁদ ও বিকল্প পথ

৭ মার্চ সকাল থেকেই ঢাকা ছিল মিছিলের নগরী। ড. কামাল হোসেনের স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, পাকিস্তানি জান্তা সেদিন সব প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল। শাহবাগ হোটেলের ছাদসহ জনসভার চারপাশের কৌশলগত পয়েন্টগুলোতে মেশিনগান বসানো হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু জানতেন, সরাসরি ‘একতরফা স্বাধীনতা’ ঘোষণা করলে পাকিস্তানি বাহিনী আকাশ ও মাটি থেকে নির্বিচারে গণহত্যা চালাবে। তাই নিরাপত্তার খাতিরে পূর্বনির্ধারিত রাস্তা বদলে বিকল্প পথে বঙ্গবন্ধুকে জনসভায় নেওয়া হয়।

ভিডিও ও অডিও ধারণের রোমাঞ্চকর ইতিহাস

তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের কঠোর নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও চলচ্চিত্র পরিচালক ও সংসদ সদস্য আবুল খায়ের ভাষণটি ভিডিও করেন এবং এইচ এন খোন্দকার অডিও রেকর্ড করেন। পরবর্তীতে এই রেকর্ডের এক কপি দেওয়া হয় বঙ্গবন্ধুকে, এক কপি পাঠানো হয় ভারতে। ভারতের রেকর্ড লেবেল এইচএমভি-র মাধ্যমে সারাবিশ্বে এর তিন হাজার কপি বিতরণ করা হয়েছিল।

আইএসআই-এর স্বীকারোক্তি

ভাষণের পরদিন পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই তাদের প্রতিবেদনে বঙ্গবন্ধুকে ‘চতুর’ আখ্যা দিয়ে উল্লেখ করে, “চতুর শেখ মুজিব চতুরতার সঙ্গে বক্তৃতা করে গেলেন। একদিকে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে গেলেন, অন্যদিকে বিচ্ছিন্নতাবাদী হওয়ার দায় নিলেন না। নীরব দর্শকের ভূমিকা ছাড়া আমাদের কিছুই করার ছিল না।”

বঙ্গবন্ধুর সেই প্রজ্ঞা আর কৌশলী দিকনির্দেশনাই শেষ পর্যন্ত বাঙালিকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র উপহার দিয়েছিল।

সূত্র: বিবিসি বাংলা, তোফায়েল আহমেদের সাক্ষাৎকার, ড. কামাল হোসেনের প্রবন্ধ এবং শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জন্মবার্ষিকীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্য।

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় বিদেশি বিনিয়োগে বড় ধাক্কা

কাঁচামাল সংকট: বন্ধ হয়ে গেল দেশের একমাত্র ডিএপি সার কারখানা

বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সি আব্দুর রউফ: রণাঙ্গনের অকুতোভয় মহানায়ক

২০ এপ্রিল ১৯৭১: বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সি আব্দুর রউফের আত্মত্যাগ ও কূটনৈতিক পরিবর্তনের দিন

নীতি-ভুলের খেসারত / মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ৩০ লাখ শিশু, ফিরছে নির্মূল হওয়া রোগ

১৯ এপ্রিল ১৯৭১: প্রবাসী সরকারের শাসনতান্ত্রিক নির্দেশনা ও রণক্ষেত্রে রক্তের দাগ

ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস আজ

১৭ এপ্রিল ১৯৭১: স্বাধীন বাংলাদেশের সূর্যোদয় ও মুজিবনগর সরকার

মুজিবনগর দিবস: এক অমর ইতিহাসের মহাকাব্য

১৬ এপ্রিল ১৯৭১: শপথের প্রতীক্ষা ও রণক্ষেত্রের আর্তনাদ

১০

মুজিবনগর ও আমাদের প্রথম সাংবিধানিক পরিচয়

১১

১২ এপ্রিল ১৯৭১: সরকারের পূর্ণাঙ্গ অবয়ব ও বালারখাইলের রক্তাক্ত ট্র্যাজেডি

১২

রক্ষাকালী মন্দির গণহত্যা: পাবনার এক রক্তাক্ত অধ্যায়

১৩

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে তাজউদ্দীন আহমদের প্রথম ভাষণ

১৪

১১ এপ্রিল ১৯৭১: তাজউদ্দীন আহমদের ভাষণ ও সংগঠিত প্রতিরোধের সূচনা

১৫

১০ এপ্রিল ১৯৭১: বাংলাদেশের প্রথম সরকার ও স্বাধীনতার সনদ

১৬

১০ এপ্রিল ১৯৭১: যখন যুদ্ধের অন্ধকারে জন্ম নেয় একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের আইনি সূর্য

১৭

০৫ এপ্রিল ১৯৭১: বহুমুখী যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

১৮

৩১ মার্চ ১৯৭১: নাথপাড়ার রক্তগঙ্গা ও বিশ্ববিবেকের গর্জন

১৯

৩০ মার্চ ১৯৭১: প্রতিরোধের আগুন ও বিশ্ববিবেকের জাগরণ

২০