

১৯৭১ সালের ১৮ জুন ছিল বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের এক গৌরবোজ্জ্বল ও একই সাথে অত্যন্ত বেদনাদায়ক একটি দিন। একদিকে ঢাকার বুকে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের দুঃসাহসিক অভিযান ও রণাঙ্গনে পাক সেনাদের ওপর একের পর এক সফল আঘাত পাকিস্তানি সামরিক জান্তাকে স্তব্ধ করে দেয়, অন্যদিকে বাগেরহাটের কান্দাপাড়ায় সংঘটিত হয় এক বর্বরোচিত ও নৃশংস গণহত্যা।
১. ঢাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের দুঃসাহসিক ক্র্যাক প্লাটুন অভিযান
ঢাকা তখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কড়া নিরাপত্তাবেষ্টনীতে অবরুদ্ধ। এই নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তাজাল ভেদ করে বীর মুক্তিযোদ্ধারা এক দুঃসাহসিক গেরিলা অভিযান পরিচালনা করেন।
হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে বিস্ফোরণ: বিশ্বব্যাংকের তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল (একজন মার্কিন ও দুজন ব্রিটিশ) ঢাকায় অবস্থান করছিলেন। তাঁরা যখন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনে গাড়িতে উঠতে যাচ্ছিলেন, তখন আকস্মিকভাবে তিনটি বোমা বিস্ফোরিত হয়। একটি বোমা গাড়ির খুব কাছে বিস্ফোরিত হওয়ায় প্রতিনিধিদলের সদস্যরা সামান্য আহত হন। এই সাহসী হামলা অবরুদ্ধ ঢাকার সামরিক প্রশাসনকে পুরোপুরি হতভম্ব করে দেয়।
গণমাধ্যমের প্রতিক্রিয়া ও তারিখ বিতর্ক: মার্কিন প্রভাবশালী পত্রিকা নিউইয়র্ক টাইমস ১৮ জুনের সংস্করণে এই খবরটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে প্রকাশ করে। পত্রিকাটিতে ঘটনাটি ১০ জুন ঘটেছে বলে উল্লেখ করা হলেও পরবর্তীতে অভিযানে অংশগ্রহণকারী মুক্তিযোদ্ধারা তাঁদের স্মৃতিচারণায় জানান, মূলত ৯ জুন এই সফল অপারেশনটি চালানো হয়েছিল।
অপারেশনের বীর যোদ্ধাগণ: এই অসম সাহসী অপারেশনে অংশ নিয়েছিলেন ক্র্যাক প্লাটুনের বীর মুক্তিযোদ্ধা আলী আহমেদ জিয়াউদ্দিন (বীর প্রতীক), হাবিবুল আলম (বীর প্রতীক), মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া (বীর বিক্রম) এবং কামরুল হক স্বপন (বীর বিক্রম)। তাঁদের বহনকারী গাড়িটি চালিয়েছিলেন শহীদ বুদ্ধিজীবী মুনীর চৌধুরীর শ্যালক তথা এফডিসির আলোকচিত্রগ্রাহক মুনির আলম মির্জা।
২. কান্দাপাড়া গণহত্যা: ১৮টি মাথা বিচ্ছিন্ন করার পৈশাচিকতা
১৮ জুন শুক্রবার জুমার নামাজের প্রাক্কালে বাগেরহাট সদরের কান্দাপাড়া বাজারে এক নারকীয় হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। কুখ্যাত রাজাকার কমান্ডার রজ্জব আলী ফকির এবং সিরাজুল হক ওরফে সিরাজ মাস্টারের নেতৃত্বে একদল সশস্ত্র রাজাকার ও শান্তি কমিটির সদস্য দুই দিক থেকে কান্দাপাড়া ও পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলো ঘেরাও করে।
তারা মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগী দেলোয়ার হোসেন মাস্টার ও ইব্রাহিম হোসেন মাস্টারের বাড়িতে গানপাউডার দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। এরপর গ্রাম থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তাকারী ও নিরীহ গ্রামবাসীদের ধরে এনে কান্দাপাড়া বাজারে জড়ো করা হয়। সেখানে ১৮ জন যুবক, ৩ জন বৃদ্ধ এবং ২ জন শিশুকে অত্যন্ত নির্মমভাবে জবাই করা হয়। ঘাতকেরা নিহতদের মাথা বিচ্ছিন্ন করে লাশের বুকের ওপর রেখে রাস্তায় সারিবদ্ধভাবে সাজিয়ে রাখে। এই পৈশাচিক গণহত্যায় মোট ২৩ জন শহীদ হন এবং ভাগ্যক্রমে মঞ্জুর মোল্লাসহ দুজন বেঁচে যান。
৩. আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও কূটনীতি
বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর কড়া বার্তা: লন্ডনে এক সাক্ষাৎকারে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ দূত বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী স্পষ্ট ভাষায় বলেন, "যারা আমাদের শিশু ও নারীদের খুন করেছে, তাদের আমরা কখনোই ক্ষমা করতে পারি না। এই গণহত্যার পর দুই অংশের একসঙ্গে থাকার আর কোনো প্রশ্নই ওঠে না। বাংলাদেশ এখন স্বাধীন রাষ্ট্র।"
প্রেসিডেন্ট নিক্সনকে কেনেডির তুলাধোনা: মার্কিন ডেমোক্র্যাট দলীয় সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম রজার্সের সাথে সাক্ষাৎ করে পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি নিয়ে প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের নীরবতার কড়া সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, মার্কিন সরকার এই মানবিক বিপর্যয়কে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে।
বিশ্বব্যাংকের ঐতিহাসিক সুপারিশ: বিশ্বব্যাংক পাকিস্তানের আর্থিক সহযোগিতা ও ঋণ কর্মসূচিগুলো অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করার সুপারিশ করে, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারতের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক প্রচারের বড় সাফল্য হিসেবে গণ্য হয়।
সুইজারল্যান্ডে ভারতের বিশেষ দূত: ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর বিশেষ দূত বিদ্যাচরণ শুক্লা বার্নে সুইজারল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে বৈঠক করে জানান, শরণার্থী সংকটে ওই অঞ্চলের শান্তি বিঘ্নিত হচ্ছে, তাই আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোকেই এর সমাধানের দায়িত্ব নিতে হবে।
জাতিসংঘের অবস্থান: জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার প্রিন্স সদরুদ্দিন আগা খান দিল্লিতে ভারতের শ্রম ও পুনর্বাসনমন্ত্রীর সাথে বৈঠক শেষে জানান, জাতিসংঘ কেবল ত্রাণের দিকটি দেখবে, কোনো রাজনৈতিক প্রশ্নে মাথা ঘামাবে না।
৪. ভারত ও পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ চিত্র
ইন্দিরা গান্ধীর দৃঢ় সংকল্প: ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী অর্থনৈতিক সম্পাদকদের সাথে বৈঠকে পুনর্ব্যক্ত করেন যে, বাংলাদেশে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ামাত্রই সব শরণার্থীকে ফেরত পাঠানো হবে, তবে এই বিশাল অর্থনৈতিক বোঝা বহন করা ভারতের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ছে।
ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সমালোচনা: সিপিআই এক বিবৃতিতে বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতি দিতে বিলম্ব করায় ভারত সরকারের তীব্র সমালোচনা করে এবং একে আমেরিকা ও চীনের কাছে মাথা নত করার শামিল বলে আখ্যা দেয়। দুই বাংলার শিল্পীদের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত: কলকাতায় শিল্পী কামরুল হাসানের সভাপতিত্বে দুই বাংলার শিল্পীদের এক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সিদ্ধান্ত হয়, আগামী আগস্টে বাংলাদেশের শিল্পীদের ছবি নিয়ে প্রদর্শনী হবে এবং বিক্রয়লব্ধ অর্থ মুক্তিযুদ্ধের তহবিলে দেওয়া হবে। পশ্চিমবঙ্গের শিল্পী চিন্তামনি কর উদীয়মান চিত্রশিল্পীদের বিনামূল্যে ক্যানভাস, রং ও তুলি দেওয়ার ঘোষণা দেন।
মুজিবনগরে কামারুজ্জামানের সংবাদ সম্মেলন: ২৫ দিন ধরে মুক্তিবাহিনীর অগ্রবর্তী ঘাঁটি পরিদর্শন শেষে স্বরাষ্ট্র ও ত্রাণমন্ত্রী এ এইচ এম কামারুজ্জামান মুজিবনগরে বলেন, "বাংলাদেশে যে যুদ্ধ চলছে, তা জনযুদ্ধ। জনযুদ্ধে সংঘবদ্ধ জনতার জয় সুনিশ্চিত।" তিনি আশা প্রকাশ করেন, ৩-৪ মাসের মধ্যে শত্রুমুক্ত হবে দেশ।
দালালদের তৎপরতা ও সাবেক মুখ্যমন্ত্রীর গ্রেফতার: পাকিস্তানে বসে জামায়াতে ইসলামীর আমির অধ্যাপক গোলাম আযম মুক্তিযোদ্ধাদের 'ভারতের চর' ও 'দুষ্কৃতকারী' আখ্যা দিয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হাতে ক্ষমতা না দেওয়ার আহ্বান জানান। অন্যদিকে, পাকিস্তানের সামরিক কর্তৃপক্ষের সাথে সহযোগিতা করতে অস্বীকৃতি জানানোয় পূর্ব বাংলার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খানকে গ্রেফতার করা হয়।
৫. রণাঙ্গনে প্রতিরোধ ও সম্মুখ যুদ্ধ
কৈখোলার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ (কুমিল্লা): কুমিল্লার কৈখোলায় মুক্তিবাহিনীর অবস্থানের ওপর পাক সেনারা গোলন্দাজ বাহিনীর সহায়তায় প্রচণ্ড আক্রমণ চালিয়ে তা দখল করে নেয়। কিন্তু একই দিন রাতে কমান্ডার মেজর সালেক চৌধুরীর নেতৃত্বে চতুর্থ বেঙ্গলের 'এ' কোম্পানি, হাবিলদার সালামের প্লাটুন এবং সুবেদার আবদুল হক ভূঁইয়ার প্লাটুন তিন দিক থেকে দ্বিমুখী ও সমন্বিত পাল্টা আক্রমণ চালায়। দুই ঘণ্টার তীব্র যুদ্ধ শেষে পাকিস্তানি বাহিনী পরাস্ত হয়ে পালিয়ে যায়। যুদ্ধে এক জেসিওসহ ৩১ জন পাক সেনা নিহত এবং অর্ধশতাধিক আহত হয়।
বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নকরণ: কুমিল্লার দক্ষিণে সড়ক ও রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার লক্ষ্যে লেঃ মাহবুবের নির্দেশে চতুর্থ বেঙ্গলের বি কোম্পানির একটি প্লাটুন বিজয়পুর রেলওয়ে ব্রিজ ও কুমিল্লা-বাগমারা সড়কের একটি সেতু বোমা মেরে উড়িয়ে দেয়। একই সাথে মিয়াবাজারের কাছে ইলেকট্রিক টাওয়ার উড়িয়ে দেওয়ায় কাপ্তাই থেকে ঢাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়।
সায়দাবাদ ফ্রন্টে তুমুল লড়াই: কুমিল্লা-ব্রাহ্মণবাড়িয়া সড়কের সায়দাবাদে লেঃ হুমায়ুন কবিরের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা পাক সেনাদের কামান ঘাঁটির পিছন থেকে অতর্কিত আক্রমণ চালান। পাক সেনারা তিনটি যুদ্ধবিমানের সহায়তা নিয়ে পাল্টা আক্রমণ চালালে মুক্তিযোদ্ধারা কৌশলে পিছু হটেন। এই সম্মুখ যুদ্ধে প্রায় ৬০ জন পাক সেনা নিহত হয়।
খিলা ও মিয়া বাজার অ্যামবুশ: মনোহরগঞ্জের খিলা রেলওয়ে স্টেশনের কাছে মুক্তিযোদ্ধাদের নিখুঁত অ্যামবুশে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একটি জিপ ধ্বংস হয় এবং ৫ সেনা নিহত হয়। মিয়াবাজারের দক্ষিণে পাক সেনাদের দুটি বাঙ্কারে আক্রমণ চালিয়ে আরও ৭ জন সৈন্য খতম করে মুক্তিযোদ্ধারা।
দিনাজপুর ও মৌলভীবাজারে জয়: দিনাজপুর জেলার ঠনঠনিয়াপাড়ায় মেজর নাজমুল হকের পরিকল্পনা অনুযায়ী মুক্তিবাহিনী তীব্র আক্রমণ চালিয়ে পাক সেনাদের হটিয়ে এলাকা নিজেদের দখলে নেয়। এতে ১৫ জন পাক সেনা নিহত হয় এবং ১ জন বাঙালি বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। এছাড়া মৌলভীবাজারে মুক্তিযোদ্ধাদের সফল আক্রমণে ২৫ জন পাকিস্তানি সিপাহি নিহত এবং ৯ জন বন্দী হয়।
তথ্যসূত্র
১. বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র: সপ্তম, অষ্টম, নবম, দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ খণ্ড।
২. বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ: সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস (সেক্টরের বিবরণী)।
৩. দৈনিক পাকিস্তান, ১৯ জুন ১৯৭১।
৪. দৈনিক ইত্তেফাক ও দৈনিক আজাদ, ১৯ জুন ১৯৭১।
৫. দৈনিক অমৃতবাজার পত্রিকা ও দৈনিক যুগান্তর (ভারত), ১৯ ও ২০ জুন ১৯৭১।
৬. দ্য স্টেটসম্যান (ভারত) এবং নিউইয়র্ক টাইমস (যুক্তরাষ্ট্র), ১৮ জুন ১৯৭১ সংখ্যা।
মন্তব্য করুন