ঢাকা শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬, ১৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
মুক্ত ভাবনামুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

জুলাই শহীদ গেজেটে আন্দোলন-বহির্ভূত মৃত্যুর নাম যেভাবে অন্তর্ভুক্ত হলো

তদন্তে বিতর্কিত মামলা, অপরাধমূলক অভিযোগ, পরস্পরবিরোধী প্রমাণ এবং উত্তরহীন আইনি প্রশ্নের কথা উল্লেখ করে সরকারের অফিসিয়াল শহীদ তালিকাকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে
এনায়েত কবির
প্রকাশ : ৩০ জুলাই ২০২৬, ১০:৫৬ পিএম
জুলাই শহীদ গেজেটে আন্দোলন-বহির্ভূত মৃত্যুর নাম যেভাবে অন্তর্ভুক্ত হলো

অনলাইন পোর্টাল ‘নর্থইস্ট নিউজ’-এ প্রকাশিত মূল প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন সিনিয়র সাংবাদিক এনায়েত কবির। ‘জুলাই কেলেঙ্কারি’ (July Scam) নিয়ে ৮ পর্বের মূল প্রতিবেদনের ৬ষ্ট পর্ব প্রিয়ভূমি পাঠকদের জন্য হুবহু বাংলায় অনুবাদ করে নিচে তুলে ধরা হলো।

বাংলাদেশের শেখ হাসিনা সরকারের পতনের দিকে ধাবিত সহিংসতার রেশ ধরে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর যারা নিহত হয়েছেন, তাদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য তৎকালীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম এবং তার দল এক অভূতপূর্ব কৌশল অবলম্বন করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

আক্রমণ, হত্যাকাণ্ড, লুটপাট, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগে লিপ্ত অবস্থায় নিহতদের অপরাধ ঢেকে রাখার একটি দৃশ্যমান প্রচেষ্টায় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দুপুরের পর একটি অপপ্রচার অভিযান শুরু হয়। দাবি করা হয় যে, আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরা “কোটা আন্দোলনকারীদের বিজয় মিছিলে হামলা চালিয়েছে।” শহীদের সংখ্যা ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানোর জন্য ‘বিজয় মিছিলে হামলা’-র এই বিবরণীটি সামনে আনা হয়।

কিন্তু এই দাবি কি আদৌ বিশ্বাসযোগ্য?

সেনাবাহিনীর চাপের মুখে শেখ হাসিনা দেশত্যাগে বাধ্য হওয়ার পরপরই আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যন্ত স্তব্ধ হয়ে পড়েছিল বলে জানা যায়। প্রাণ বাঁচাতে দলীয় নেতা-কর্মীরা গা ঢাকা দেন এবং দেশ-বিদেশের বিভিন্ন আত্মগোপনস্থলে ছড়িয়ে পড়েন।

এমন পরিস্থিতিতে, এই ‘পলাতক’ ও দিশেহারা আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরা শেখ হাসিনার নির্দেশ পালন করে ‘কোটা বিপ্লবীদের’ ওপর হামলা চালিয়ে তাদের হত্যা করেছে—এমন দাবি বিশ্বাস করা কঠিন।

৫ আগস্ট এবং তার পর ঘটে যাওয়া হত্যাকাণ্ডের সাথে সম্পর্কিত বেশিরভাগ ফার্স্ট ইনফরমেশন রিপোর্ট (এফআইআর), পাশাপাশি সেদিন দুপুরের পরের ঘটনা নিয়ে দায়ের করা অভিযোগগুলোতে একটি একই ধরণের অভিযোগ ছিল—ভিকটিমরা "বিজয় মিছিলে অংশ নেওয়ার সময়" আক্রান্ত হয়েছিলেন।

৫ আগস্ট বিকেলে হাসিনা দেশ ছাড়তে বাধ্য হওয়ার পর, আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা নিজেরাও হত্যাকাণ্ডের শিকার হন।

সংসদ সদস্য, মন্ত্রী ও দলীয় নেতাদের বাসভবন ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা, লুটপাট, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। সারা দেশে চরম আতঙ্ক, সহিংসতা, আইনশৃঙ্খলাহীনতা ও ব্যাপক অগ্নিসংযোগের পরিবেশ বিরাজ করছিল।

এমনকি আওয়ামী লীগকে লক্ষ্য করে হামলা ও লুটপাটের সময় নিজেদের লাগানো আগুনে পুড়ে মারা যাওয়া ব্যক্তিদেরও পরবর্তীতে ‘শহীদ’ মর্যাদা দিয়ে ‘জুলাই শহীদ গেজেটে’ অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

লেখক মনে করেন, এই বিবরণীর মূল উদ্দেশ্য ছিল আত্মঘাতী বা ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড আড়াল করা। বিষয়টি তাদের কেবল ‘শহীদ’ মর্যাদা দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। বরং, পরবর্তীতে যাদের বাড়িঘরে এই ব্যক্তিরা লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের সময় মারা গেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে, সেই বাড়ির মালিকদের বিরুদ্ধেই তাদের অপহরণ ও পুড়িয়ে হত্যার অভিযোগ এনে ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়।

সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য এবং আওয়ামী লীগের নেতা, কর্মী ও সমর্থকদের বাদ দিয়ে ২০২৪ সালের ৬ জুন থেকে ৫ আগস্টের মধ্যে নিহত সকল ব্যক্তিকে "জুলাই শহীদ" এবং একই সময়ে আহতদের ‘জুলাই যোদ্ধা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

৬ জুন থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত সময়কালকে কেউ কেউ বিপ্লব এবং কেউ কেউ অভ্যুত্থান হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তবে, সময়ের পরিক্রমায় অনেকে এখন জুলাই-আগস্টের ঘটনাকে একটি সমন্বিত দেশি-বিদেশি চক্রান্ত—একটি ‘সূক্ষ্ম পরিকল্পনা’—হিসেবে গণ্য করছেন এবং লেখকের মতে, আন্দোলনকারীদের নিজেদের বক্তব্যের মধ্যেই এমন স্বীকারোক্তি খুঁজে পাওয়া যায়।

সরকারি প্রজ্ঞাপন জারির আগে নিহত পুলিশ কর্মকর্তা, আনসার সদস্য, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) সদস্য বা সরকার নিয়ন্ত্রিত অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করা হয়নি।

একইভাবে, আওয়ামী লীগের যেসব নেতা, কর্মী ও সমর্থক কোটা আন্দোলনের কর্মী বা জনতা কর্তৃক নিহত হয়েছিলেন, তাদের কোনো অফিসিয়াল তালিকা তৈরি করা হয়নি।

সরকার, আইসিটির প্রসিকিউশন টিম এবং অন্যান্য সরকারি তদন্ত সংস্থার সরবরাহ করা তথ্যের ভিত্তিতে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থা একটি একপেশে তদন্ত পরিচালনা করে। পরিশেষে তারা স্বীকার করে যে ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে দেশজুড়ে নিহত ১,৪০০ মানুষের মধ্যে শিক্ষার্থী, সাধারণ নাগরিক, পথচারী, পুলিশ কর্মকর্তা, আনসার সদস্য, র‌্যাব সদস্য এবং আওয়ামী লীগের নেতা, কর্মী ও সমর্থক ছিলেন।

এই ফলাফলটি অসাবধানতাবশত ৫ আগস্টের পর পুলিশ সদস্য ও আওয়ামী লীগ কর্মীরা নিজেরাই গণহত্যার শিকার হয়েছিলেন—এমন দাবিকে সমর্থন জোগায়।

৫ আগস্টের আগের রাত পর্যন্ত প্রতিদিন পরিকল্পিতভাবে গুজব ছড়ানো হতো যে সারা দেশে হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে হত্যা করা হয়েছে বা গুম করা হয়েছে। এমনকি উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিরাও এসব গুজবে বিশ্বাস করেছেন এবং তা ছড়িয়েছেন।

৫ আগস্টের পর, কথিত নিহত বা নিখোঁজের সংখ্যা প্রথমে ৪,০০০ বলে দাবি করা হয়, পরে তা কমিয়ে ৩,০০০, পরবর্তীতে ২,০০০ এবং অবশেষে জাতিসংঘের হিসাবে ১,৪০০-তে নামিয়ে আনা হয়।

যদিও জনপরিসরে ১,৪০০ শিক্ষার্থী ও সাধারণ নাগরিক নিহত হওয়ার কথা বলা হতে থাকে, তবে অফিসিয়াল ‘জুলাই শহীদ গেজেট’ দুই দফায় হালনাগাদ করা হয়—১৫ জানুয়ারি ৮৩৪টি নাম এবং ৩০ জুন ১০টি নাম—যার ফলে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত মোট শহীদের সংখ্যা দাঁড়ায় ৮৪৪ জনে।

অন্তর্বর্তীকালীন ও বর্তমান সরকারের মতে, এই ৮৪৪ জন ব্যক্তি আন্দোলনে অংশ নেওয়ার সময় আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে পরিচালিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং তৎকালীন সরকারি দলের নেতা-কর্মীদের হাতে নিহত হন। ফলে সরকার দাবি করে যে কেবল আন্দোলনে নিহতদেরই শহীদ গেজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

তবে বিগত দশ মাস ধরে পরিচালিত তদন্ত ও গবেষণায় এই দাবি মিথ্যা ও ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়েছে। আন্দোলনে সংশ্লিষ্টতা নেই এমন ব্যক্তিদের নাম অন্তর্ভুক্ত করে ‘জুলাই গেজেট’ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সম্প্রসারিত করা হয়েছে।

জুলাই গেজেটে তালিকাভুক্ত এমন একাধিক ব্যক্তি ছিলেন যাদের মৃত্যু আন্দোলনের সাথে সম্পর্কিত ছিল না; যার মধ্যে রয়েছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া, জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ, হার্ট অ্যাটাক, হিটস্ট্রোক, কিডনি রোগ, জেল থেকে পালানোর চেষ্টা, কারাগারে হামলা, এমনকি নিজেদের আগ্নেয়াস্ত্রের অসাবধানতাবশত গুলিবর্ষণ।

তিনটি সুনির্দিষ্ট ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অগ্নিসংযোগের ঘটনায় অংশ নেওয়ার সময় সৃষ্ট আগুনে পুড়ে মারা গিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। গেজেট নম্বর, স্থান ও পরিস্থিতি উল্লেখ করে সেগুলোর বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হলো:

১ম ঘটনা: নাটোরের ঘটনা

প্রথম উদাহরণটি নাটোর-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম শিমুলের বাসভবন সংক্রান্ত। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার পর, “ছাত্র ও সাধারণ জনতা” পরিচয়ে একদল লোক শিমুলের বাসভবন ‘জান্নাতী প্যালেসে’ হামলা চালায়, ভাঙচুর করে এবং ভেতরের মালামাল লুটপাট করে।

জীবনের ভয়ে শিমুল ও তার পরিবার আক্রমণের অনেক আগেই বাসভবন ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছিলেন। হামলাকারীরা শিমুলের পাঁচতলা পারিবারিক বাসভবন ও পৈতৃক বাড়িতেও লুটপাট চালায় বলে অভিযোগ রয়েছে।

একদল লোক যখন জান্নাতী প্যালেসে লুটপাট করতে ঢোকে, তখন অন্য দল ভবনে আগুন ধরিয়ে দেয়। আগুনের তীব্রতা বাড়লে ভেতরে থাকা ব্যক্তিরা আটকে পড়েন এবং পুড়ে ও ধোঁয়ায় শ্বাসরোধ হয়ে মারা যান।

পরদিন সকালে সেনাবাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতিতে ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা চারজনের মরদেহ উদ্ধার করে—একজন ছাদ থেকে, একজন তিনতলার বারান্দা থেকে এবং দুজন দোতলার একটি কক্ষ থেকে। পরে লাশগুলো শনাক্ত করে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

এই চারজন নিহত হওয়া ছাড়াও মেহেদী হাসান রবিন নামে আরেকজন গুরুতর দগ্ধ হন কিন্তু প্রাথমিকভাবে বেঁচে যান। তাকে প্রথমে নাটোর সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, পরে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ন ইউনিটে স্থানান্তরিত করা হয়, যেখানে ৭ আগস্ট সকালে তিনি মারা যান।

নিহত পাঁচজন হলেন: শাওন খান সিয়াম, মিকদাদ হোসেন খান আকিব, শরিফুল ইসলাম মোহন, ইয়াসিন আলী এবং মেহেদী হাসান রবিন।

আন্দোলন শেষ হওয়ার পর লুটপাটে অংশ নিতে গিয়ে নিজেদের সৃষ্টি করা আগুনে আটকে পড়ে মারা যাওয়া সত্ত্বেও এই পাঁচজন ব্যক্তিকেই ‘জুলাই শহীদ গেজেটে’ অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

গেজেটে তাদের ক্রমিক নম্বরগুলো হলো:

  • গেজেট নং ২৮৮: শাওন খান সিয়াম
  • গেজেট নং ২৮৯: মিকদাদ হোসেন খান আকিব
  • গেজেট নং ২৯০: শরিফুল ইসলাম মোহন
  • গেজেট নং ২৯১ ইয়াসিন আলী
  • গেজেট নং ২৯২ মেহেদী হাসান

নিহত মিকদাদ হোসেন খান আকিবের বাবা স্থানীয় জামায়াত নেতা দেলোয়ার হোসেন খান ১৭ সেপ্টেম্বর শেখ হাসিনা, সাবেক সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম শিমুল এবং ২৪ জন আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীকে আসামি করে এবং অনেক অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

একই দিনে, সাবেক ইসলামী ছাত্রশিবির নেতা এবং নিহত শরিফুল ইসলাম মোহনের ভাই এস এম সেলিম মাসুম শেখ হাসিনা, সাবেক এমপি শফিকুল ইসলাম শিমুল, ২৩ জন আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী এবং অনেক অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিকে আসামি করে আরেকটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। উভয় এফআইআরেই হাসিনাকে হত্যার নির্দেশদাতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

একই ঘটনায় নিহত ইয়াসিনের বাবা ফজের আলী ১৮ আগস্ট বিকেলে নাটোর সদর থানায় শেখ হাসিনা ও সাবেক এমপি শফিকুল ইসলাম শিমুলসহ ১১১ জনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

এছাড়া, নিহত মেহেদী হাসান রবিনের মামা পরিচয় দিয়ে সোহেল রানা নামে এক ব্যক্তি ২৬ আগস্ট সদর থানায় সাবেক এমপি শফিকুল ইসলাম শিমুলসহ ১৩৫ জনকে আসামি করে আরেকটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

২য় ঘটনা: লালমনিরহাটের ঘটনা

দ্বিতীয় ঘটনাটিও প্রায় একই ধরনের। ৫ আগস্ট বিকেলে দুষ্কৃতকারীরা লালমনিরহাটে আওয়ামী লীগ নেতা, কর্মী ও এমপিদের বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে বলে অভিযোগ রয়েছে। সে সময় একদল উগ্র হামলাকারী কালীবাড়ি এলাকায় লালমনিরহাট জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন সুমন খানের খালি বাড়িতে ভাঙচুর, লুটপাট ও আগুন ধরিয়ে দেয়।

হামলা চালানোর সময় মালামাল লুট করতে বাড়িতে ঢোকা ছয়জন ব্যক্তি ভেতরে আটকা পড়েন, কারণ তাদের সহযোগীরা ভবনটিতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল। ফলে তারা আগুনে পুড়ে মারা যান। তারা হলেন লালমনিরহাট জেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি জাহিদুল ইসলাম খোকা মিয়ার ছেলে আল শাহ রিয়াদ (তন্ময়); জুবায়ের হোসেন; শাহরিয়ার আল আফরোজ শ্রাবণ; জাহিদুর রহমান জনি; রাজিব উল করিম সরকার; এবং রাদিফ হোসেন রুশো।

রাত আনুমানিক ২:৩০ টায়, সেনা সদস্যদের উপস্থিতিতে লালমনিরহাট ফায়ার সার্ভিসের একটি দল সাখাওয়াত হোসেন সুমনের আগুনে পোড়া বাড়ি তল্লাশি করে ওই ছয় ব্যক্তির দগ্ধ মরদেহ উদ্ধার করে। আন্দোলন শেষ হওয়ার পর ফাঁকা বাড়িতে হামলা চালিয়ে নিজেদের লাগানো আগুনে পুড়ে মারা যাওয়া সত্ত্বেও এই ছয়জনের নামই 'জুলাই শহীদ গেজেটে' অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

গেজেটে তাদের ক্রমিক নম্বরগুলো নিম্নরূপ

  • গেজেট নং ৭১৩: আল শাহ রিয়াদ (তন্ময়)
  • গেজেট নং ৭১৪: মোহাম্মদ জুবায়ের হোসেন
  • গেজেট নং ৭১৫: মোহাম্মদ শাহরিয়ার আল আফরোজ শ্রাবণ
  • গেজেট নং ৭২৯: মোহাম্মদ জাহিদুর রহমান (জনি)
  • গেজেট নং ৭৮২: মোহাম্মদ রাজিব উল করিম সরকার
  • গেজেট নং ৭৮৩: মোহাম্মদ রাদিফ হোসেন রুশো

যাকে একটি বিস্ময়কর ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, আরমান আরিফ নামে এক ব্যক্তি গত ২৭ মে লালমনিরহাট সদর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। উক্ত ৬টি দগ্ধ মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় বাড়ির মালিক সাখাওয়াত হোসেন সুমন খানসহ ৩৮ জন আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী এবং আরও ৩০-৩৫ জন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিকে আসামি করা হয়। তৃতীয় ঘটনাটি ঘটে ঠাকুরগাঁওয়ে।

৫ আগস্ট সন্ধ্যায় একদল দুষ্কৃতকারী ঠাকুরগাঁও রোড এলাকার বালিয়াডাঙি মোড়ে কয়েকটি দোকানে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালায় বলে অভিযোগ রয়েছে। এরপর তারা প্রাক্তন পৌর কাউন্সিলর ও ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সদস্য মোহাম্মদ একরামউদ্দৌলা (উর্ফে সাহেব)-এর বাসভবনে হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে।

ঘটনার সময় ছয়জন হামলাকারী গুরুতর দগ্ধ হন বলে জানা গেছে। চিতচিলং গ্রামের আইনুল হকের ছেলে ও পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক আল মামুন এবং হরিহরপুর গ্রামের প্রয়াত সাইফ উদ্দিনের ছেলে সাহান পারভেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যান। পরবর্তীতে অরাজি পাইকপাড়া গ্রামের জাকির হোসেনের ছেলে রকিবুল হাসান রকি এবং চিতচিলং গ্রামের ফজলে আলমের ছেলে রায়হানুল চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

জুলাই শহীদ ও জুলাই যোদ্ধাদের পরিবারের কল্যাণ ও পুনর্বাসন অধ্যাদেশ'-এ উল্লেখিত সংজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও, হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ চালানোর সময় নিজেদের লাগানো আগুনে পুড়ে মারা যাওয়া চারজন ব্যক্তিকেই ‘জুলাই শহীদ’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়।

গেজেটে তাদের ক্রমিক নম্বরগুলো হলো:

  • গেজেট নং ৮০২: মোহাম্মদ সাহান পারভেজ
  • গেজেট নং ৮০৩: মোহাম্মদ রকিবুল হাসান
  • গেজেট নং ৮০৪: মোহাম্মদ রায়হানুল হাসান
  • গেজেট নং ৮০৭: মোহাম্মদ আল মামুন

পরবর্তীতে, নিহত রকিবুল হাসান রকির বাবা জাকির হোসেন ২১ আগস্ট ঠাকুরগাঁও সদর থানায় ৭৭ জন আওয়ামী লীগ সদস্য এবং ১৫০-২০০ জন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

একইভাবে, ২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর জামায়াত নেতা ও নিহত রায়হানের বাবা ফজলে আলম ঠাকুরগাঁওয়ের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ৯১ জন আওয়ামী লীগ সদস্য এবং ১৫০-২০০ জন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিকে আসামি করে একটি অভিযোগ দায়ের করেন। আদালত পরবর্তীতে অভিযোগটি এজাহার/এফআইআর হিসেবে গ্রহণ করার নির্দেশ দেন।

৫ আগস্ট দুপুর আনুমানিক ১২:০০ টা থেকে, সেনাপ্রধান জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেবেন—এই ঘোষণার পরপরই আওয়ামী লীগের প্রায় সমস্ত নেতা-কর্মী—কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যন্ত—রাজনৈতিক পরিবর্তন কিংবা জীবনের ভয়ে রাস্তা ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যান।

৫ আগস্ট দুপুরের পর রাজপথে আওয়ামী লীগের কোনো সক্রিয় সদস্যকে দেখা যায়নি, এবং দেশ থেকে হাসিনার প্রস্থানের পর ব্যাপক মব ভায়োলেন্স, অস্থিরতা ও আইনশৃঙ্খলাহীনতা তাদের সেদিনের সন্ধ্যা থেকে আত্মগোপনে যেতে বাধ্য করে।

উপরে উল্লিখিত তিনটি ঘটনার কোনোটিতেই যে বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছিল, সেগুলোর মালিকরা ঘটনার সময় উপস্থিত ছিলেন না। এটি প্রশ্ন তোলে যে কেন এবং কীভাবে পরবর্তীতে সেই ব্যক্তিদের ফৌজদারি মামলায় আসামি করা হলো। তাছাড়া, যিনি ততক্ষণে বাংলাদেশ ত্যাগ করেছিলেন, সেই হাসিনাকে কীভাবে আসামি করা সম্ভব?

এই প্রশ্নগুলো প্রমাণ করে যে মামলাগুলো ছিল ভিত্তিহীন, মিথ্যা, বানোয়াট এবং অসৎ উদ্দেশ্যে সুপরিকল্পিত। পরিশেষে এটি নিশ্চিত করে যে, যাদের মৃত্যু আন্দোলনের সাথে সম্পর্কিত ছিল না, বরং যারা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করার সময় মারা গেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে, তাদেরও 'জুলাই শহীদ গেজেটে' অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

জুলাই শহীদ গেজেটে আন্দোলন-বহির্ভূত মৃত্যুর নাম যেভাবে অন্তর্ভুক্ত হলো

হাঁড়ি জ্বলছে না বাসায়, ঢাকা জুড়ে চরম গ্যাস সংকট

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি, উত্তপ্ত চট্টগ্রাম-ফেনী / হবিগঞ্জে বাধার পর সিলেটেও এনসিপির গাড়িবহরে হামলা

আবু সাঈদ হত্যা / এক মৃত্যুর হাজারো প্রশ্ন

‘ভারতীয় এজেন্ট’ আতঙ্ক ও শহীদ গেজেট বিতর্ক

কওমি মাদ্রাসায় শিশু নির্যাতন ও জঙ্গিবাদ: এক অনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার ভয়াবহ চিত্র

গ্রিন ইয়ার্ডের আড়ালে রক্তের দাগ / জাহাজভাঙায় শতকোটির বিনিয়োগেও থামছে না মৃত্যু

অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক সমাজ গড়ার প্রত্যয় শেষ হলো ‘বর্ষামঙ্গল উৎসব ১৪৩৩’

তীব্র গ্যাসসংকটে ধুঁকছে শিল্পখাত, উৎপাদনে স্থবিরতায় চরম ভোগান্তিতে গ্রাহক

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণকবরের দাবি একটি ‘কল্পকাহিনী’

১০

‘টেসলা’ সমাচার: বৃষ্টি এলেই ভাড়া দ্বিগুণ, রাস্তায় নামলেই ঝুঁকি

১১

‘জুলাই শহীদ’ গেজেটের অর্ধেক মৃত্যুই ৫ আগস্ট-এর পর

১২

কীভাবে বাখের আলী বাংলাদেশের ‘গেজেটভুক্ত’ জুলাই শহীদ তালিকায় ‘কবির’ হয়ে গেলেন

১৩

আঁধারেই ডুবে আছে রাজধানী / বাতিহীন রাস্তায় বাড়ছে ছিনতাই, দুর্ঘটনা আর নিরাপত্তাহীনতার ভয়

১৪

নগরায়ণের চাপ, পাল্টে যাচ্ছে খাদ্যাভ্যাস

১৫

মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির এক বছর / শোক, স্মৃতি আর বিচার পাওয়ার আকুতিতে কাটল বিষাদময় দিন

১৬

স্পেনের বিশ্বজয়, মেসির বিষাদ / ১৬ বছর পর আবার বিশ্বসেরা লা রোখারা

১৭

স্থানীয় সরকার নির্বাচন / পরিস্থিতি খারাপ হলে মাঠে থাকবে সেনাবাহিনী, বিধিমালা সংশোধনের উদ্যোগ ইসির

১৮

দুদকে ফাইলবন্দি ৮ হাজার অভিযোগ, পদের জন্য ৩২৭ আবেদন

১৯

শেখ হাসিনা ও আজিজসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন জমা

২০