ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৫ মার্চ ২০২৬, ২১ ফাল্গুন ১৪৩২
মুক্ত মনমুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

৪ মার্চ ১৯৭১: রাজপথ রক্তাক্ত হয় মুক্তিকামী মানুষের মিছিলে

প্রিয়ভূমি প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৪ মার্চ ২০২৬, ০৫:০৬ পিএম
বঙ্গবন্ধুর ডাকা অসহযোগ আন্দোলনে সাড়া ছিল কতটা সর্বাত্মক, টেলিভিশনের এ ঘটনা তার সাক্ষ্য হয়ে আছে। ১৯৭১ সালের ১ মার্চ থেকে এ ভূখণ্ড ক্যান্টনমেন্টের নির্দেশে নয়- পরিচালিত হচ্ছিল বঙ্গবন্ধুর। তিনি স্বাধীনতার ডাক দিয়েছেন | ছবি: সংগৃহীত

১৯৭১ সালের ৪ মার্চ ছিল বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের এক অবিস্মরণীয় দিন। অসহযোগ আন্দোলনের তৃতীয় দিনে এসে পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থা কার্যত অচল হয়ে পরে এবং রাজপথ রক্তাক্ত হয় মুক্তিকামী মানুষের মিছিলে।

বেসামরিক শাসনব্যবস্থার অবসান ও অচলাবস্থা

৪ মার্চ ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকা টানা ৬ দিনের হরতালের তৃতীয় দিন। এদিন পূর্ব পাকিস্তানের বেসামরিক শাসনব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। সচিবালয় থেকে শুরু করে সরকারি-বেসরকারি অফিস, আদালত, ব্যাংক, বিমা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে তালা ঝুলে যায়। প্রদেশজুড়ে পাকিস্তানি জান্তার কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না; বরং প্রতিটি স্তরে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশই ছিল শেষ কথা।

রাজপথের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ও হতাহত

সামরিক বাহিনী আন্দোলন দমনে কঠোর অবস্থান নিলে সারা দেশে মৃত্যুর মিছিল শুরু হয়।

চট্টগ্রাম: ২ ও ৩ মার্চ চট্টগ্রামে সংঘর্ষে নিহতের সংখ্যা ১২১-এ পৌঁছায়। ৪ঠা মার্চ সেখানে ১১৪নং সামরিক আদেশ জারি করা হয় এবং পরিস্থিতি অত্যন্ত থমথমে থাকে।

খুলনা: খুলনায় সান্ধ্য আইন (কারফিউ) উপেক্ষা করে ২৫ হাজার মানুষ হাদিস পার্কে জমায়েত হয়। সেখানে মিছিলে পাকিস্তানি বাহিনী গুলি চালালে এবং রেললাইন অপসারণের সময় পুলিশের গুলিতে মোট ৭ জন শহীদ হন।

রাজশাহী: এখানে ১০ ঘণ্টা সান্ধ্য আইন জারি করা হয়। উপাচার্যকে হুমকি দেওয়া হয় যে কোনো ছাত্রকে রাস্তায় দেখা মাত্র গুলি করা হবে। ৩ জন ছাত্রকে গ্রেপ্তার করা হয়।

যশোর: মিছিলে পাকিস্তানি বাহিনীর গুলিতে চারুবালা ধর শহীদ হন, যিনি ছিলেন ওই অঞ্চলের প্রথম দিকের নারী শহীদদের একজন।

বেতার ও টেলিভিশনের নাম পরিবর্তন: ঐতিহাসিক বাঁক

বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনে প্রচারমাধ্যমগুলো এদিন একাত্মতা ঘোষণা করে।

রেডিও পাকিস্তান ঢাকা কেন্দ্রের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘ঢাকা বেতার কেন্দ্র’।

পাকিস্তান টেলিভিশনের নাম বদলে হয় ‘ঢাকা টেলিভিশন’।

বেতার ও টেলিভিশন শিল্পীরা আন্দোলনের সাথে সংহতি প্রকাশ করে অনুষ্ঠান বর্জন করেন এবং দেশাত্মবোধক গান ও বঙ্গবন্ধুর নির্দেশাবলি প্রচার শুরু করেন।

বঙ্গবন্ধুর আহ্বান ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক বিবৃতিতে বীর জাতিকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, “চরম ত্যাগ স্বীকার ছাড়া কোনোদিন কোনো জাতির মুক্তি আসেনি।” তিনি ৫ ও ৬ মার্চ সকাল ৬টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত হরতাল পালনের ডাক দেন। তবে সাধারণ কর্মচারীরা যাতে বেতন পেতে পারেন, সেজন্য আড়াইটা থেকে সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট অফিস খোলা রাখার নির্দেশ দেন।

সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ববিন্দুর অবস্থান

সাহেবজাদা ইয়াকুব খানের পদত্যাগ: লে. জে. সাহেবজাদা ইয়াকুব খান গভর্নর ও সামরিক আইন প্রশাসকের পদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন। এরপর কুখ্যাত লে. জে. টিক্কা খানকে পূর্বাঞ্চলের গভর্নর নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

রাও ফরমান আলীর তৎপরতা: রাত ১১টায় রাও ফরমান আলী বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে গিয়ে সমঝোতার প্রস্তাব দেন এবং সামরিক শক্তির ভয় দেখানোর চেষ্টা করেন।

মওলানা ভাসানীর হুঁশিয়ারি: মওলানা ভাসানী লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি জানান এবং পাকিস্তানি জান্তাকে ‘সাম্রাজ্যবাদীদের দালাল’ আখ্যা দিয়ে হুঁশিয়ার করেন।

আসগর খানের দাবি: করাচিতে এয়ার মার্শাল (অব.) আসগর খান অবিলম্বে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা শেখ মুজিবের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি জানান।

ছাত্র ও জনশক্তির প্রস্তুতি

কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে ছাত্র ইউনিয়নের জনসভা থেকে পাড়ায় পাড়ায় ‘সংগ্রাম কমিটি’ ও ‘মুক্তিবাহিনী’ গঠনের ডাক দেওয়া হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি ‘পাকিস্তান অবজারভার’ পত্রিকার গণবিরোধী ভূমিকার নিন্দা জানান। এছাড়া ঢাকা মেডিকেল কলেজে আহতদের জন্য শত শত মানুষ স্বেচ্ছায় রক্তদান করে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।

৪ঠা মার্চের ঘটনাবলি প্রমাণ করে যে, পূর্ব পাকিস্তান তখন কেবল কাগজে-কলমে পাকিস্তানের অংশ ছিল। বাস্তবে এটি ছিল বঙ্গবন্ধুর শাসনাধীন এক বিদ্রোহী জনপদ, যা পূর্ণ স্বাধীনতার দিকে ধাবিত হচ্ছিল। সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগ এবং সরকারি কর্মকর্তাদের অসহযোগিতাই একাত্তরের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিল।

তথ্যসূত্র

১. মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের নথিপত্র ও ওয়েবসাইট।

২. ১৯৭১ সালের ৪ঠা ও ৫ই মার্চে প্রকাশিত ‘দৈনিক ইত্তেফাক’ ও ‘পাকিস্তান অবজারভার’।

৩. ১৯৭২ সালের মার্চ মাসে ‘দৈনিক বাংলা’য় প্রকাশিত ধারাবাহিক প্রতিবেদন।

৪. ‘The Daily Star’ আর্কাইভ (মার্চ ৪, ১৯৭১ সংক্রান্ত বিশেষ প্রতিবেদন)।

৫. বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র।

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

পহেলা মার্চ দুপুর থেকেই শুরু হয় সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন

৪ মার্চ ১৯৭১: রাজপথ রক্তাক্ত হয় মুক্তিকামী মানুষের মিছিলে

ক্ষমতা ছাড়ার আগে নিরাপত্তা নিশ্চিতে নিজেকে ভিভিআইপি ঘোষণা ইউনূসের

আইনের প্যাঁচে ঝুলে গেল জুলাই সনদ

২ মার্চ জাতীয় পতাকা দিবস সরকারিভাবে পালন করা উচিত

‘বাংলাদেশ’ শব্দটি যেভাবে আমাদের হলো

১-‌৭ মার্চ, ১৯৭১: বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ

৩ মার্চ: স্বাধীনতার ইশতেহার ও বাঙালির মুক্তি-সনদ ঘোষণা

পতাকা উত্তোলন দিবস যেন হারিয়ে না যায়

২ মার্চ ১৯৭১: মানচিত্রখচিত পতাকায় অঙ্কিত হয়েছিল স্বাধীনতার স্বপ্ন

১০

মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন

১১

১ মার্চ ১৯৭১: জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ও উত্তাল জনপদ

১২

অগ্নিঝরা মার্চ: অস্তিত্বের সংগ্রাম ও মহাকাব্যিক স্বাধীনতার পদাবলি

১৩

তুরস্কের ‘সফট পাওয়ার’ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন

১৪

কালার রেভল্যুশন ও জনরোষ: ইতিহাসের এক নির্মোহ ব্যবচ্ছেদ

১৫

বুদ্ধিজীবীর ফ্যাসিবাদ ও ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি

১৬

নতুন সরকারকে সতর্কবার্তা / অন্তর্বর্তী সরকারের মার্কিন বাণিজ্য চুক্তিতে ‘স্তম্ভিত’ সিপিডি

১৭

প্রিয়ভূমির প্রামাণ্যচিত্রমালা: ফেব্রুয়ারি, বাঙালির আত্মপরিচয়ের সংগ্রাম

১৮

বিচার কি অভিমুখ বদলাচ্ছে? / এটিএম আজহার ও আকরামের খালাস এবং আগামীর রাজনীতি

১৯

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে দেশীয় ঋণ বেড়েছে ১.১৩ লাখ কোটি টাকা

২০