

৭ জুন, বাঙালি জাতির স্বাধিকার আন্দোলন ও মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে এক অনন্য, অবিস্মরণীয় এবং রক্তস্নাত দিন—ঐতিহাসিক ‘ছয় দফা দিবস’। ১৯৬৬ সালের এই দিনে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত ছয় দফা দাবির পক্ষে তপ্ত রাজপথে নেমে এসেছিল টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ার আপামর জনতা। স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের লেলিয়ে দেওয়া পুলিশ ও তৎকালীন ইপিআর (ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস)-এর গুলিতে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও টঙ্গীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মনু মিয়া, শফিক, শামসুল হকসহ ১১ জন মুক্তিকামী বাঙালি শহীদ হন। এই রক্তপাতের মধ্য দিয়েই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতির গতিপথ চিরতরে বদলে যায় এবং অঙ্কুরিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশের অবিনাশী বীজ।
পটভূমি: বৈষম্য আর শোষণের আবর্তে পূর্ব বাংলা
১৯৪৭ সালে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই পূর্ব বাংলার বাঙালিরা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সামরিক ক্ষেত্রে চরম বৈষম্যের শিকার হতে থাকে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সিংহভাগ কুক্ষিগত করে রাখে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী। বিশেষ করে ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় পূর্ব পাকিস্তান সম্পূর্ণ অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকে। এই ঘটনা বাঙালিদের মনে তীব্র নিরাপত্তাহীনতা এবং স্বায়ত্তশাসনের আকাঙ্ক্ষাকে আরও বেগবান করে তোলে।
লাহোর সম্মেলন ও ‘ছয় দফা’র উত্থাপন
পাকিস্তানি শাসন, শোষণ ও বঞ্চনা থেকে মুক্তির লক্ষ্যে ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি লাহোরে তৎকালীন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের সব বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে একটি জাতীয় সম্মেলন (সাবজেক্ট কমিটি) আহ্বান করা হয়। নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি নবাবজাদা নসরুল্লাহ খানের নেতৃত্বে আয়োজিত এই সম্মেলনে পূর্ব বাংলার জনগণের পক্ষে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ‘ছয় দফা’ দাবি উত্থাপন করেন।
পরদিন অর্থাৎ ৬ ফেব্রুয়ারি সম্মেলনের মূল আলোচ্যসূচিতে যাতে এই দাবি স্থান পায়, তার জন্য বঙ্গবন্ধু জোর অনুরোধ জানান। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানি আয়োজক ও রক্ষণশীল বিরোধী নেতারা এই দাবিকে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ আখ্যা দিয়ে প্রত্যাখ্যান করেন। এর প্রতিবাদে বঙ্গবন্ধু সম্মেলনে যোগ না দিয়ে লাহোরে অবস্থানকালেই সাংবাদিকদের সামনে ছয় দফা তুলে ধরেন। পশ্চিম পাকিস্তানের গণমাধ্যমগুলো তখন শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা’ হিসেবে অপপ্রচার শুরু করে।
মুক্তির সনদের মূল বক্তব্য (The Magna Carta of Bengalis)
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকায় ফিরে ১৩ মার্চ দলীয় কার্যনির্বাহী সংসদে ছয় দফা কর্মসূচি পাস করিয়ে নেন এবং জনগণের মাঝে তা ছড়িয়ে দেন। ছয় দফার মূল নির্যাস ছিল স্বায়ত্তশাসন, যার মূল বক্তব্য নিচে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
| দফা | মূল বিষয়বস্তু ও দাবি |
| ১ম দফা | শাসনতান্ত্রিক কাঠামো ও রাষ্ট্রের প্রকৃতি: ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পাকিস্তানকে একটি সত্যিকারের ফেডারেশন বা যুক্তরাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে, যেখানে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার থাকবে এবং প্রাপ্তবয়স্কদের সর্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে আইনসভা গঠিত হবে। |
| ২য় দফা | কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা: কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে থাকবে কেবল দুটি বিষয়—প্রতিরক্ষা (Defence) এবং পররাষ্ট্র (Foreign Affairs)। অন্যান্য সব বিষয় প্রাদেশিক সরকারের অধীনে থাকবে। |
| ৩য় দফা | মুদ্রা ও অর্থ বিষয়ক ক্ষমতা: দুই অঞ্চলের জন্য দুটি পৃথক অথচ সহজে বিনিময়যোগ্য মুদ্রা থাকবে; অথবা সমগ্র দেশের জন্য একটিই মুদ্রা থাকবে, তবে পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে মূলধন পাচার রোধে সংবিধানে কার্যকর ও সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা থাকতে হবে। পূর্ব বাংলার জন্য আলাদা স্টেট ব্যাংক থাকবে। |
| ৪র্থ দফা | রাজস্ব, কর ও শুল্ক বিষয়ক ক্ষমতা: কর ও শুল্ক ধার্য ও আদায় করার সম্পূর্ণ ক্ষমতা থাকবে প্রাদেশিক সরকারের হাতে। আদায়কৃত রাজস্বের একটি নির্দিষ্ট অংশ ফেডারেল তহবিলে জমা হবে। |
| ৫ম দফা | বৈদেশিক বাণিজ্য বিষয়ক ক্ষমতা: দুই অঞ্চলের অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার আলাদা হিসাব থাকবে এবং প্রাদেশিক সরকার নিজস্ব তদারকিতে বৈদেশিক বাণিজ্য ও চুক্তি করতে পারবে। |
| ৬ষ্ঠ দফা | আঞ্চলিক সেনাবাহিনী গঠনের ক্ষমতা: পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা ঝুঁকি কমানোর জন্য এখানে আধা-সামরিক (প্যারা-মিলিটারি) বা আঞ্চলিক সেনাবাহিনী গঠন এবং নৌবাহিনীর সদর দফতর পূর্ব পাকিস্তানে স্থাপন করতে হবে। |
৭ জুনের গণজাগরণ ও রক্তক্ষয়ী হরতাল
ছয় দফা ঘোষণার পর বঙ্গবন্ধু বাংলার আনাচে-কানাচে প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে সুদীর্ঘ প্রচারাভিযান শুরু করেন। এটি দ্রুতই শোষিত-বঞ্চিত মানুষের ‘মুক্তির সনদ’ বা ‘ম্যাগনা কার্টা’ হিসেবে জনপ্রিয়তা লাভ করে। এর জনপ্রিয়তায় ভীত হয়ে সামরিক জান্তা আইয়ুব খান এই আন্দোলন দমাতে দমন-পীড়ন শুরু করে এবং ১৯৬৬ সালের ৮ মে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠায়।
নেতার গ্রেফতারের প্রতিবাদে এবং ছয় দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে সর্বদলীয় ছাত্র-জনতার উদ্যোগে ৭ জুন দেশব্যাপী পূর্ণাঙ্গ ও সর্বাত্মক হরতাল আহ্বান করা হয়। সেদিন পুরো পূর্ব বাংলা অচল হয়ে পড়ে। তেজগাঁও, টঙ্গী, নারায়ণগঞ্জে শ্রমিক-জনতা রাজপথে নেমে এলে পুলিশ ও ইপিআর নির্বিচারে গুলি চালায়। এতে মনু মিয়া, শফিক, শামসুল হকসহ ১১ জন বীর বাঙালি শহীদ হন এবং হাজার হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়। এই রক্তদানের মাধ্যমে ছয় দফা আন্দোলন এক গণবিস্ফোরণে রূপ নেয়।
ছয় দফা থেকে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ: এক অবিচ্ছিন্ন সংযোগসূত্র
ছয় দফা কেবল স্বায়ত্তশাসনের দাবি ছিল না, এটি ছিল মূলত বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রথম রূপরেখা। বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদেরা মনে করেন, ছয় দফাকে স্তব্ধ করতে পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠী একের পর এক চক্রান্ত করেছিল। আন্দোলনের তীব্রতা দমাতে স্বৈরশাসক আইয়ুব খান ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিব ও অন্যান্য’ তথা ঐতিহাসিক আগতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে বঙ্গবন্ধুকে ফাঁসি দেওয়ার ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র করে।
কিন্তু বাংলার ছাত্র-জনতা ১৯৬৯ সালের ৪ জানুয়ারি ‘সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করে ছয় দফাকে অন্তর্ভুক্ত করে ১১ দফা আন্দোলন শুরু করে। এই ১১ দফার ওপর ভর করেই রাজপথে নেমে আসে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, যার চাপে আইয়ুব খানের পতন ঘটে এবং বঙ্গবন্ধু কারাগার থেকে মুক্ত হন।
এরই ধারাবাহিকতায় আসে ১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচন, যেখানে বাংলার মানুষ ছয় দফার পক্ষে আওয়ামী লীগকে একচেটিয়া ও নিরঙ্কুশ রায় দেয়। এরপরও যখন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তরে অস্বীকৃতি জানায়, তখন বঙ্গবন্ধু জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। যার চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে শুরু হওয়া সশস্ত্র মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে এবং বিশ্বমানচিত্রে অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ছয় দফা দিবসটি প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে দেশপ্রেম, স্বাধিকার চেতনা এবং অধিকার আদায়ের এক অবিনাশী অনুপ্রেরণা হিসেবে জাগ্রত রয়েছে। ৭ জুনের শহীদদের রক্ত বৃথা যায়নি; তাঁদের সেই আত্মত্যাগের পথ ধরেই অর্জিত হয়েছে আজকের লাল-সবুজ পতাকার বাংলাদেশ।
তথ্যসূত্র
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, 'কারাগারের রোজনামচা' ও 'অসমাপ্ত আত্মজীবনী'
তোফায়েল আহমেদ-এর বিশেষ নিবন্ধ ও স্মৃতিকথা
দৈনিক ইত্তেফাক ও সমকালীন সংবাদপত্র আর্কাইভ (১৯৬৬ ও পরবর্তী সময়কাল)
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র (সংশ্লিষ্ট খণ্ডসমূহ)
মন্তব্য করুন