

বাংলাদেশের মাদক অপরাধের মানচিত্রে এক ভয়াবহ ও নীরব রূপান্তর ঘটেছে। প্রথাগত হেরোইন, ফেনসিডিল, গাঁজা কিংবা ইয়াবার যুগ পেরিয়ে দেশের মাদক বাজারে এখন রাজত্ব করছে উচ্চমূল্যের ও অতি-আসক্তিকর ‘সিনথেটিক’ বা কৃত্রিম মাদক। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি এড়াতে এসব মাদক সীমান্ত পথের চেয়ে বেশি ছড়াচ্ছে প্রযুক্তির অলিগলি ব্যবহার করে। ডার্ক ওয়েব, ক্রিপ্টোকারেন্সি এবং এনক্রিপ্টেড যোগাযোগের মাধ্যমে ঘরের কোণে বসেই তরুণদের একাংশ জড়িয়ে পড়ছে এই মরণনেশায়।
বিশেষজ্ঞ ও অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, বিগত ২০১৮ সালের পর থেকে দেশে অন্তত এক ডজনেরও বেশি নতুন জাতের কৃত্রিম মাদকের সন্ধান মিলেছে। এই তালিকায় রয়েছে এমডিএমবি, আইস (ক্রিস্টাল মেথ), এলএসডি, খাথ, ফেন্টানাইল, ব্ল্যাক কোকেন, এমডিএমএ, ডিএমটি, ডিওবি, ম্যাজিক মাশরুম, কুশ, ট্যাপেন্টাডল, ট্রামাডল এবং কিটামিন। অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়ায় এই মাদকগুলোর মূল ভোক্তা মূলত উচ্চবিত্ত বা ধনিক শ্রেণির তরুণ প্রজন্ম।
প্রথাগত ও আধুনিক মাদক: সমান্তরাল আতঙ্কের পরিসংখ্যান
নতুন মাদকের আগ্রাসনের মধ্যেও পুরনো মাদক চোরাচালানের গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) ও আইনশৃঙ্খল রক্ষাকারী বাহিনীর সাম্প্রতিক জব্দ তালিকা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রথাগত মাদকের বাজারও আগের চেয়ে বিস্তৃত হয়েছে।
| মাদকের ধরন | বিগত বছরের মাসিক গড় উদ্ধার | চলতি বছরের প্রথম ৩ মাসের চিত্র |
| ইয়াবা | ৩৬ লাখ পিস (প্রতি মাসে) | মোট ১ কোটি ২০ লাখ+ পিস (প্রতি মাসে গড়ে ৪০ লাখ+) |
| হেরোইন | ১৬৬ কেজি (পুরো বছরে) | ৬১ কেজি (মাত্র ৩ মাসে) |
| কোকেন | ১৪ কেজি ৬০০ গ্রাম (পুরো বছরে) | ১৬ কেজি (মাত্র ৩ মাসে) |
সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, যে পরিমাণ মাদক উদ্ধার হচ্ছে, আইনের চোখ ফাঁকি দিয়ে তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি পৌঁছে যাচ্ছে সেবনকারীদের হাতে।
প্রযুক্তির ছদ্মবেশ: ডার্ক ওয়েব ও ক্রিপ্টোকারেন্সির ব্যবহার
নতুন প্রজন্মের মাদক কারবারের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো এর বিপণন পদ্ধতি। এই সিনথেটিক মাদকগুলোর অন্তত ৯০ শতাংশ কেনাবেচা ও অর্থ লেনদেন হয় অনলাইনে।
ভার্চুয়াল পেমেন্ট: আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্যমতে, আন্তর্জাতিক পার্সেল সার্ভিসের (ইএমএস ও সাধারণ কুরিয়ার) মাধ্যমে অভিনব কায়দায় মাদক দেশে আনার পর এনক্রিপ্টেড অ্যাপস ব্যবহার করে যোগাযোগ করা হয়। অর্থ পরিশোধে ব্যবহার করা হচ্ছে ই-ওয়ালেট এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি (ডিজিটাল মুদ্রা)।
সরবরাহ রুট: ডিএনসি তিনটি প্রধান রুট চিহ্নিত করেছে—বৈধ ওষুধের সরবরাহ চেইন (ফার্মাসিউটিক্যাল সাপ্লাই চেইন), আন্তর্জাতিক কুরিয়ার ও পার্সেল সার্ভিস এবং আন্তঃসীমান্ত চোরাচালান চক্র।
“তিন-চার বছর ধরে বেশ কিছু নতুন মাদক ধরা হয়েছে। এগুলো মূলত উঠতি বয়সীদের টার্গেট করে ছড়ানো হচ্ছে। ডার্কওয়েবে ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহারের মাধ্যমে তারা এসব অর্ডার করে। আমরা এই অনলাইন চক্রগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রেখেছি।” — মো. মেহেদী হাসান, উপপরিচালক (গোয়েন্দা শাখা, ঢাকা বিভাগ), ডিএনসি।
রাজধানী জুড়ে ‘মিনি ল্যাব’: বিদেশি সিন্ডিকেটের থাবা
সিনথেটিক ড্রাগস এখন আর কেবল বিদেশ থেকে তৈরি হয়ে আসছে না, বরং রাজধানীর বুকেই গড়ে উঠছে এর অস্থায়ী প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র বা ‘মিনি ল্যাব’।
সম্প্রতি উত্তরার ১০ নম্বর সেক্টরের একটি ফ্ল্যাটে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) এক অভিযানে আন্তর্জাতিক মাদক চক্রের ভয়াবহ চিত্র সামনে আসে। সেখানে তিন চীনা নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়, যারা একটি অস্থায়ী ল্যাব তৈরি করে তরল কিটামিনকে পাউডারে রূপান্তর করছিল। এরপর সেই মাদক ব্লুটুথ স্পিকার ও সাউন্ড ইকুইপমেন্টের ভেতরে লুকিয়ে পাচার করা হচ্ছিল। ওই ফ্ল্যাট থেকে জব্দ করা হয়:
তদন্তকারীরা বলছেন, চক্রগুলো ক্রমান্বয়ে আইস, এলএসডি, ম্যাজিক মাশরুম এবং সর্বশেষ এমডিএমবি’র মতো মাদক বাজারে ছড়িয়ে ক্রেতাদের আসক্ত করছে। এই চক্রের পেছনে বড় একটি অংশ বিদেশি নাগরিক।
আইনি সীমাবদ্ধতা ও ‘২০২৬ সালের সংশোধিত আইন’
বিদ্যমান মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ দিয়ে এই আধুনিক প্রযুক্তি-নির্ভর ও ভার্চুয়াল মাদক অপরাধ মোকাবেলা করা কঠিন হয়ে পড়ছিল। কারণ সেখানে অনলাইন ক্রাইম বা ক্রিপ্টোকারেন্সির স্পষ্ট ব্যাখ্যা ছিল না। এই শূন্যতা পূরণে সরকার সম্প্রতি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ (সংশোধন) ২০২৬-এর খসড়া প্রণয়ন করেছে।
প্রস্তাবিত নতুন আইনের মূল কঠোর বিধানসমূহ
ডিজিটাল মাধ্যমে অপরাধ: ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, মোবাইল অ্যাপ কিংবা কোনো এনক্রিপ্টেড মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে মাদক কেনাবেচা বা পরিবহন করা ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
ভার্চুয়াল লেনদেনে নিষেধাজ্ঞা: মাদকের মূল্য পরিশোধে ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেম, ই-ওয়ালেট বা ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করা সম্পূর্ণ অবৈধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে।
জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা: বিশেষজ্ঞদের হুঁশিয়ারি
চিকিৎসক ও মাদক বিশ্লেষকদের মতে, সিনথেটিক মাদকের সবচেয়ে বড় বিপদ হলো এর দ্রুত আসক্তি তৈরির ক্ষমতা। এটি মানুষের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রকে সরাসরি আঘাত করে, যা ব্যবহারকারীকে অল্প দিনেই স্থায়ী শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধকতার দিকে ঠেলে দেয়।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. সাখাওয়াত হোসেন সতর্ক করে বলেন, “সরকার যদি এখনই কঠোর ও সমন্বিত উদ্যোগ না নেয়, তবে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে সিনথেটিক বা কৃত্রিম মাদকই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে। ইয়াবার চেয়েও বড় সামাজিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে এই নতুন মাদক।”
দেশের যুবশক্তির এই অবক্ষয় নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থার (মানস) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অধ্যাপক ড. অরূপ রতন চৌধুরী। তিনি বলেন, “দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ তরুণ ও যুবক। মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র বলছে, এদের একটি বড় অংশ ধীরে ধীরে মাদকের বিষাক্ত জালে জড়িয়ে পড়ছে। এর কোনো নির্ভুল সরকারি জরিপ না থাকাটা উদ্বেগের।”
সরকারি অবস্থান
প্রযুক্তির আড়ালে চলা এই সরবরাহ চেইনের ওপর আরও নিবিড় তদারকি প্রয়োজন বলে মনে করছেন অপরাধ গবেষকরা। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের তৎপরতা জোরদার রাখার দাবি করেছে। পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন এ প্রসঙ্গে জানান, মাদক কারবারি ও সেবীদের বিরুদ্ধে পুলিশের 'জিরো টলারেন্স' নীতি অব্যাহত রয়েছে। নতুন প্রজন্মের মাদকের নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে গোয়েন্দা নজরদারি ও কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান।
মন্তব্য করুন