

জোরপূর্বক বা জবরদস্তিমূলক শ্রমের মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্যের বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে পর্যাপ্ত পদক্ষেপ না নেওয়ার অভিযোগে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৬০টি দেশের ওপর অতিরিক্ত আমদানি শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। গত মঙ্গলবার (২ জুন) ওয়াশিংটনে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি দপ্তর (ইউএসটিআর) এই বিতর্কিত ও কঠোর প্রস্তাবনাটি ঘোষণা করে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ৩০১(বি) ধারা ব্যবহার করে এই শুল্ক আরোপের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
ইউএসটিআর-এর দাবি, গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদারদের জবরদস্তিমূলক শ্রম রোধে এই ব্যর্থতা মার্কিন অভ্যন্তরীণ বাজার ও শ্রমিকদের জন্য একটি অসম প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করছে। প্রস্তাবিত এই কাঠামো অনুযায়ী, দেশগুলোর ওপর ১০ থেকে সাড়ে ১২ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত শুল্ক গুনতে হতে পারে, যা কার্যকর হলে বিশ্ব বাণিজ্যে, বিশেষ করে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কোন দেশের ওপর কত শুল্ক: দুই ভাগে বিভক্ত ৬০ দেশ
ইউএসটিআর তাদের প্রস্তাবনায় স্পষ্ট করেছে, যেসব দেশ ইতোমধ্যেই জোরপূর্বক শ্রমের ওপর আংশিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে অথবা পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে এমন নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হবে। আর যেসব দেশের এই সংক্রান্ত কোনো কার্যকর ব্যবস্থা বা চুক্তি নেই, তাদের পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে ১২.৫ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত শুল্ক দিতে হবে।
১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্কের আওতায় থাকা দেশ ও অঞ্চল
বাংলাদেশ, কানাডা ও মেক্সিকো, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও ব্রিটেন, পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়া, আর্জেন্টিনা, কম্বোডিয়া, ইকুয়েডর, এল সালভাদর, গুয়াতেমালা, মালয়েশিয়া ও তাইওয়ান।
১২.৫ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্কের আওতায় থাকা দেশ
চীন, ভারত, জাপান, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডসহ তালিকায় থাকা বাকি ৪৫টি দেশ।
কেন এই আকস্মিক শুল্কের প্রস্তাব?
যুক্তরাষ্ট্রের জরুরি শুল্ক ব্যবস্থা পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ট্রাম্প প্রশাসন এই নতুন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর আগে গত ফেব্রুয়ারি মাসে দেশটির সুপ্রিম কোর্টের এক রায়ে ট্রাম্প প্রশাসনের পূর্ববর্তী জরুরি শুল্ক ব্যবস্থা বাতিল হয়ে গিয়েছিল। সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইনের (IEEPA) অধীনে ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের ক্ষমতা আগামী ২৪ জুলাই শেষ হতে যাচ্ছে (যা গত ২০ ফেব্রুয়ারি ১০ শতাংশ অস্থায়ী শুল্ক হিসেবে আরোপ করা হয়েছিল)। ফলে, আইনি জটিলতা এড়াতে এবং শুল্ক ব্যবস্থা ধরে রাখতে এবার ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে ট্রাম্প প্রশাসন।
পোশাক খাতের জন্য বিশেষ কোটা ও শুল্কমুক্ত পণ্যের তালিকা
রপ্তানিকারকদের জন্য কিছুটা স্বস্তির বিষয় হলো, এই পদক্ষেপটি এখনই কার্যকর হচ্ছে না। এটি বর্তমানে পর্যালোচনার অধীনে রয়েছে এবং আগামী ৬ জুলাই পর্যন্ত এ বিষয়ে লিখিত মতামত জমা দেওয়ার সুযোগ থাকবে।
এ ছাড়া মার্কিন বাণিজ্য দপ্তর একটি বিশেষ ‘টেক্সটাইল মেকানিজম’ বা আলাদা ব্যবস্থার প্রস্তাব করেছে। এর অধীনে নির্দিষ্ট পরিমাণ পোশাক ও টেক্সটাইল পণ্যকে কিছুটা হ্রাসকৃত বা কম শুল্ক হারে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে। তবে এই কোটার বিস্তারিত হার বা পরিমাণ এখনো চূড়ান্ত করেনি ইউএসটিআর।
শুল্কের আওতামুক্ত থাকছে যেসব পণ্য
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, জবরদস্তিমূলক শ্রম সংক্রান্ত এই শুল্কের আওতার বাইরে থাকবে নির্দিষ্ট কিছু অতি প্রয়োজনীয় ও কৌশলগত পণ্য। যেমন:
জ্বালানি ও জ্বালানি তেল।
রেয়ার আর্থ (বিরল মৃত্তিকা) এবং নির্দিষ্ট কিছু কৌশলগত ধাতু।
গরুর মাংস, কফি, নির্দিষ্ট কিছু ফল ও সবজি।
জীবনরক্ষাকারী ওষুধ ও জৈব রাসায়নিক উপাদান।
বিমানের যন্ত্রাংশ।
চীনসহ ১৬ দেশের বিরুদ্ধে আরও তদন্ত
জোরপূর্বক শ্রমের বাইরেও মার্কিন প্রশাসন তাদের বাণিজ্যিক সুরক্ষাবাদ আরও কঠোর করছে। ইউএসটিআর জানিয়েছে, তারা শিগগিরই চীনসহ ১৬টি প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার দেশের ‘অতিরিক্ত শিল্প সক্ষমতা’ (Industrial Overcapacity) বৃদ্ধির ওপর চলমান তদন্তের ফলাফল প্রকাশ করবে।
বাণিজ্য বিশ্লেষকরা বলছেন, ৬ জুলাই পর্যন্ত মতামত গ্রহণের পর জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে এই শুল্কের চূড়ান্ত রূপরেখা জানা যাবে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হওয়ায়, ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্কের এই প্রস্তাব বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিল। তবে ‘টেক্সটাইল মেকানিজম’-এর কোটা সুবিধা বাংলাদেশ কতটা আদায় করতে পারে, তার ওপরই নির্ভর করছে আগামী দিনের রপ্তানি বাণিজ্য।
মন্তব্য করুন