ঢাকা মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ১৫ বৈশাখ ১৪৩৩
মুক্ত মনমুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

২৮ এপ্রিল ১৯৭১: বিশ্ববিবেকের ডাক ও রণাঙ্গনে প্রতিরোধের নতুন মাত্রা

প্রিয়ভূমি প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:০৭ পিএম
মুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১ | ছবি: আনন্দবাজার

১৯৭১ সালের ২৮ এপ্রিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ দিন। এদিন একদিকে যেমন বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের পক্ষে কূটনৈতিক চাপ ও সংহতি বৃদ্ধি পায়, অন্যদিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর পৈশাচিক গণহত্যা এবং তার বিপরীতে মুক্তিযোদ্ধাদের মরণপণ প্রতিরোধ ও বীরত্বগাথা নতুন মাত্রা পায়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীরবতা ভাঙতে শুরু করে এবং রণাঙ্গনে হানাদারদের মোকাবিলায় মুক্তিবাহিনী তাদের অবস্থান সুদৃঢ় করে।

বিশ্বজনমতের চাপ ও কূটনৈতিক তৎপরতা

এদিন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ এক ঐতিহাসিক বিবৃতি প্রদান করেন। তিনি বিশ্বের সকল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও মুক্তিকামী মানুষের প্রতি বাংলাদেশের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়ে বলেন, “এই মুহূর্তে বৈশ্বিক সাহায্য জরুরি। আমি বিশ্বের সকল বাঙালি ও মুক্তিকামী মানুষকে বাংলাদেশের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অনুরোধ করছি।”

কূটনৈতিক পর্যায়েও বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়:

সোভিয়েত ইউনিয়নের হস্তক্ষেপ: তৎকালীন সোভিয়েত প্রধানমন্ত্রী এলেক্সি কোসিগিন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে একটি জরুরি বার্তা পাঠান। তিনি স্পষ্ট ভাষায় পূর্ব পাকিস্তানে অবিলম্বে গণহত্যা বন্ধ করার দাবি জানান।

কলকাতার বুদ্ধিজীবী সমাজের উদ্বেগ: তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, গোপাল হালদার, বিষ্ণু দে-সহ প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবীরা ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নিকট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তি নিশ্চিত করার জন্য হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

বিশ্ব শান্তি পরিষদের প্রস্তাব: এই সম্মেলনে বাংলাদেশের নিরীহ মানুষের ওপর চলমান গণহত্যা বন্ধ এবং বঙ্গবন্ধুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পাকিস্তান সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগের দাবি জানানো হয়।

অন্যদিকে, পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে ভারতীয় রাষ্ট্রদূতকে ডেকে এনে হুমকি প্রদান করে পাকিস্তানি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, যা দুই দেশের সম্পর্কের চরম অবনতির ইঙ্গিত দেয়।

কল্যাণপুরে গণহত্যা: মানবতার চরম অবমাননা

২৮ এপ্রিল ভোরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের স্থানীয় দোসর অবাঙালি বিহারিরা ঢাকার কল্যাণপুর, পাইকপাড়া, পীরেরবাগ, শ্যামলী, গাবতলী ও টেকনিক্যাল এলাকায় ভয়াবহ গণহত্যা চালায়। মিরপুর ও মোহাম্মদপুর থেকে আগত ঘাতক দলগুলো রড, লাঠি, তলোয়ার, কুড়াল, বল্লম ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে নিরীহ বাঙালি নর-নারী ও শিশুদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। লুটপাট, অগ্নিসংযোগ এবং অমানবিক নির্যাতনের পর জবাই করে হত্যা করা হয় বহু মানুষকে।

একই রাতে সূত্রাপুরের সাধু বাবা শ্রীধাম পাল ও তার বাড়ির অবস্থানরত ২০ জনকে ধরে নিয়ে বুড়িগঙ্গা নদীর পাড়ে নির্মমভাবে হত্যা করে নদীতে ভাসিয়ে দেয় রাজাকার ও পাকিস্তানি সৈন্যরা। মিরপুর ও মোহাম্মদপুরে টহলরত পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর গেরিলা আক্রমণ চালাতে গিয়ে এদিন সাতজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন।

রণাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহসী প্রতিরোধ

গোটা দেশজুড়ে পাকিস্তানি বাহিনীর অত্যাচারের বিপরীতে মুক্তিপাগল বাঙালির প্রতিরোধ ছিল অপ্রতিরোধ্য।

মাধবপুর ও মনতলার যুদ্ধ: মৌলভীবাজারের মাধবপুরে পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর তীব্র আক্রমণ চালায় মুক্তিবাহিনী। প্রচণ্ড গোলাগুলিতে হানাদার বাহিনীর প্রায় ৩০০ সৈন্য নিহত হয়। এই যুদ্ধে সিপাহি খালেদ ও সিপাহি শাহজাহান বীরত্বের সাথে লড়াই করে শহীদ হন।

বিমান ভূপাতিত: সিলেট অঞ্চলে মুক্তিবাহিনী খাসিয়া পাহাড় ও মেঘালয় সীমান্তের শ্রীহট্ট ফ্রন্টে পাকিস্তানিদের একটি যুদ্ধবিমান গুলি করে ভূপাতিত করে।

কুড়িগ্রাম ও অন্যান্য ফ্রন্ট: কুড়িগ্রামের ধরলা নদীতে নৌকা পার হওয়ার সময় হানাদার বাহিনীর ৫ সৈন্যকে গুলি করে হত্যা করে মুক্তিবাহিনী। এছাড়া চট্টগ্রাম ও বগুড়া অঞ্চলে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের খণ্ডযুদ্ধ ও প্রতিরক্ষা ব্যূহ তৈরির সংবাদ পাওয়া যায়।

আন্তর্জাতিক ও ভারতীয় গণমাধ্যমে পরিস্থিতি

এদিন ভারতীয় সংবাদপত্র ‘অমৃতবাজার’ ও ‘যুগান্তর’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে বাংলাদেশের বিভিন্ন রণাঙ্গনের বিশদ চিত্র উঠে আসে।

প্রতিবেদনে জানানো হয়, দিনাজপুর ও কিশোরগঞ্জের অনেক এলাকা থেকে হানাদারদের হটিয়ে দিয়ে মুক্তিবাহিনী তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে।

বগুড়া, ময়মনসিংহ ও কুমিল্লা ফ্রন্টের বিভিন্ন স্থানে মুক্তিবাহিনীর প্রবল প্রতিরোধের মুখে পাকিস্তানি বাহিনী কোণঠাসা হয়ে পড়ছে।

চট্টগ্রাম বন্দরে শ্রমিকদের জোরপূর্বক কাজে লাগানোর চেষ্টা ব্যর্থ হয়; শ্রমিকরা কাজ ছেড়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে যোগ দিতে শুরু করে।

এদিন শান্তি ও কল্যাণ পরিষদের সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা নুরুজ্জামান এক বিবৃতিতে সেনাবাহিনীকে সহযোগিতার আহ্বান জানিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ শক্তিকে দমন করার ষড়যন্ত্র করেন, যা রাজাকার ও আলবদর বাহিনীর সক্রিয়তারই প্রতিফলন ছিল।

২৮ এপ্রিল ১৯৭১ ছিল একাধারে শোক ও শক্তির দিন। একদিকে হানাদারদের নারকীয় হত্যাকাণ্ডে কেঁপে উঠেছিল ঢাকার জনপদ, অন্যদিকে রণাঙ্গনে মুক্তিবাহিনীর একের পর এক সফল অভিযান এবং আন্তর্জাতিক সমর্থন প্রাপ্তি বাংলাদেশের স্বাধীনতার পথকে আরও নিশ্চিত করে তোলে। বিশ্ববিবেকের সাড়া এবং মুক্তিপাগল মানুষের আত্মত্যাগ সেদিনের সেই অগ্নিঝরা দিনে প্রমাণ করেছিল, স্বাধীনতা এখন আর কেবল স্বপ্ন নয়, অনিবার্য সত্য।

তথ্যসূত্র

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র, ষষ্ঠ, অষ্টম ও নবম খণ্ড।

দৈনিক অমৃতবাজার পত্রিকা, ২৮ এপ্রিল ১৯৭১।

দৈনিক যুগান্তর পত্রিকা, ২৮ এপ্রিল ১৯৭১।

দৈনিক পাকিস্তান, ২৮ এপ্রিল ১৯৭১।

কল্যাণপুর গণহত্যা - আলী আকবর টাবী।

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

২৮ এপ্রিল ১৯৭১: বিশ্ববিবেকের ডাক ও রণাঙ্গনে প্রতিরোধের নতুন মাত্রা

২৭ এপ্রিল ১৯৭১: বিশ্ববিবেকের জাগ্রত কণ্ঠ ও রণাঙ্গনের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম

পুলিশি বাধায় পিছু হটেননি সুপারিশপ্রাপ্ত শিক্ষকরা / নিয়োগপত্রের দাবিতে শাহবাগে অবস্থান কর্মসূচি

জামায়াতকে রাজনৈতিকভাবে নির্মূলের ডাক মির্জা ফখরুলের

মুক্তিযুদ্ধের দলিলচিত্রের রূপকার কিংবদন্তি আলোকচিত্রী রঘু রাই আর নেই

২৬ এপ্রিল ১৯৭১: রক্তক্ষয়ী গণহত্যা ও বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধের এক ঐতিহাসিক দলিল

ইউনূসের ১৮ মাস / অর্থনীতির গভীর ক্ষত ও এক ‘ফোকলা’ উত্তরাধিকারের খতিয়ান

তপ্ত জনপদে অন্ধকারের শাসন

জয়পুরহাটের পাকিস্তানি বাহিনীর নিষ্ঠুর গণহত্যায় আজও আতঙ্কিত স্বজনহারা পরিবার

২৫ এপ্রিল ১৯৭১: পাকিস্তানি বাহিনীর নিষ্ঠুরতা ও আন্তর্জাতিক কূটনীতির সমীকরণ

১০

২৪ এপ্রিল ১৯৭১: সীমান্ত উত্তেজনা, কূটনৈতিক টানাপোড়েন ও প্রতিরোধ সংগ্রাম

১১

২২ এপ্রিল ১৯৭১: মুক্তির বারুদ আর পৈশাচিকতার কালো ছায়া

১২

২১ এপ্রিল ১৯৭১: শ্রীঅঙ্গনে নারকীয় গণহত্যা ও ভাসানীর কূটনৈতিক উদ্যোগ

১৩

রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় বিদেশি বিনিয়োগে বড় ধাক্কা

১৪

কাঁচামাল সংকট: বন্ধ হয়ে গেল দেশের একমাত্র ডিএপি সার কারখানা

১৫

বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সি আব্দুর রউফ: রণাঙ্গনের অকুতোভয় মহানায়ক

১৬

২০ এপ্রিল ১৯৭১: বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সি আব্দুর রউফের আত্মত্যাগ ও কূটনৈতিক পরিবর্তনের দিন

১৭

নীতি-ভুলের খেসারত / মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ৩০ লাখ শিশু, ফিরছে নির্মূল হওয়া রোগ

১৮

১৯ এপ্রিল ১৯৭১: প্রবাসী সরকারের শাসনতান্ত্রিক নির্দেশনা ও রণক্ষেত্রে রক্তের দাগ

১৯

ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস আজ

২০