

আজ ঐতিহাসিক ৭ মার্চ। বাঙালি জাতির দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের এক মহিমান্বিত দিন। ১৯৭১ সালের এই দিনে তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এক বিশাল জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ডাক দেন। ১০ লাখেরও বেশি মুক্তিকামী মানুষের উপস্থিতিতে তিনি বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেন, ‘রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরও দেবো, এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাআল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’
বঙ্গবন্ধুর এই কালজয়ী ভাষণে বাংলার আপামর জনতা খুঁজে পায় স্বাধীনতার চূড়ান্ত দিকনির্দেশনা। ১৮ মিনিটের এই সংক্ষিপ্ত অথচ তেজস্বী ভাষণের পর সারা দেশের মানুষ ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। ৯ মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে ৩০ লাখ শহীদের রক্ত ও ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত হয় স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ।
বিশ্ব দরবারে স্বীকৃতি
বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ কেবল একটি রাজনৈতিক ভাষণ নয়, এটি বাঙালির সাংস্কৃতিক ও জাতীয় পরিচয়ের অনন্য দলিল। ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা (ইউনেস্কো) এই ভাষণকে ‘বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য’ (World Documentary Heritage) হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং একে ‘মেমোরি অফ দ্য ওয়ার্ল্ড রেজিস্টার’-এ অন্তর্ভুক্ত করে। এছাড়া ২০১৩ সালে লেখক জ্যাকব এফ ফাইল্ডের ‘উই শ্যাল ফাইট অন দ্য বিচেস’ নামক সংকলনে এই ভাষণটি আড়াই হাজার বছরের বিশ্বসেরা অন্যতম যুদ্ধকালীন ভাষণ হিসেবে স্থান পায়। ভাষণটি বিশ্বের অসংখ্য ভাষায় অনূদিত হয়েছে।
সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশের সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণকে সংবিধানের ১৫০(২) অনুচ্ছেদের পঞ্চম তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ২০২০ সালে উচ্চ আদালতের নির্দেশনায় দিনটিকে ‘জাতীয় দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং ২০২১ সাল থেকে এটি ‘ক’ শ্রেণিভুক্ত দিবস হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত হয়ে আসছিল।
বর্তমান পরিস্থিতি
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত বছরের ১৬ অক্টোবর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ দিবসটির রাষ্ট্রীয় উদযাপন বাতিল করে। একইসঙ্গে নির্বাহী আদেশে এর আগের সরকারি ছুটিও বাতিল করা হয়। ২০২৫ সালে দিবসটি রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত হয়নি এবং পাঠ্যপুস্তক থেকেও এই ভাষণের অংশ বিশেষ বাদ দেওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
বর্তমান নবনির্বাচিত সরকার এ বছর দিবসটি রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন করবে কি না, তা নিয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে বিগত বছরগুলোতে আওয়ামী লীগসহ মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনগুলো দিনটি পালন করে আসছে। এমনকি ২০২২ ও ২০২৩ সালে বড় রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপিও দলীয়ভাবে দিবসটি পালন করেছিল। আজ রাজধানীসহ সারা দেশে বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে ঐতিহাসিক এই দিনটি শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা হচ্ছে।
মন্তব্য করুন