

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ নৌ-কমান্ডোদের দুঃসাহসিক ও ইতিহাসপ্রসিদ্ধ অভিযান ‘অপারেশন জ্যাকপট’-এর অনন্য জলবীরত্ব স্মরণে এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর যোদ্ধাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাতে সম্প্রতি রাজধানীর ধানমন্ডিস্থ রাশিয়ান সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে (রাশিয়ান হাউজ) এক বিশেষ স্মারক আলোচনা, সম্মাননা প্রদান ও বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। ‘স্মৃতি একাত্তর’ এবং ‘রাশিয়ান হাউজ’-এর যৌথ উদ্যোগে এই অনুষ্ঠানটি সফলভাবে সম্পন্ন হয়। আয়োজনে ১৯৭১ সালের অদম্য নৌ-কমান্ডোদের বীরত্বগাথার পাশাপাশি স্বাধীনতা-উত্তরকালে চট্টগ্রাম বন্দর পুনর্গঠন ও মাইন অপসারণ অভিযানে আত্মদানকারী সোভিয়েত নৌসেনা ইউরি রেডকিনকে (ইউরি ভিক্টোরোভিচ রেডকিন) অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয় এবং বিশেষ সম্মাননা জানানো হয়।
রোববার (১৬ আগস্ট) বিকেলে ঢাকায় আয়োজিত এই স্মৃতিচারণ ও বীরবরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে প্রেরিত বাণীতে বাংলাদেশে নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আলেক্সান্ডার গ্রেগরোভিচ খোজিন বাংলাদেশের জীবিত নৌ-কমান্ডো এবং মুক্তিযুদ্ধের সকল বীর সেনানীর প্রতি বিশেষ শ্রদ্ধা ও শুভকামনা ব্যক্ত করেন। একই সঙ্গে ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী বিজয়ের পর বিধ্বস্ত চট্টগ্রাম বন্দরকে নিরাপদ ও চঞ্চল করতে সমুদ্র তলদেশের মাইন অপসারণ এবং ডুবে যাওয়া যুদ্ধজাহাজ ও ধ্বংসাবশেষ সরানোর জটিল কার্যক্রমে নিজের জীবন উৎসর্গকারী বীর রাশিয়ান সেনা ইউরি রেডকিনকে স্মরণ করায় ও সম্মাননা দেওয়ায় আয়োজকদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি। রাষ্ট্রদূতের এই গুরুত্বপূর্ণ লিখিত বার্তাটি অনুষ্ঠানে পাঠ করে শোনান রাশিয়ান সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের পরিচালক আলেক্সান্দ্রিয়া ক্লেভনয়।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত বীর নৌ-কমান্ডো এবং জলযোদ্ধারা ১৯৭১ সালের আগস্ট মাসের সেই শিহরণ জাগানো ও ঐতিহাসিক নদী ও সমুদ্র অভিযানের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার কথা আবেগঘন কণ্ঠে তুলে ধরেন। স্মৃতিকথায় তাঁরা জানান, ১৯৭১ সালের ১৫ আগস্ট গভীর রাতে ভারতীয় আকাশবাণী রেডিও থেকে প্রচারিত গান—‘আমার পুতুল আজকে যাবে শ্বশুরবাড়ি’—ছিল তাঁদের চূড়ান্ত আক্রমণের গোপন সংকেত বা কোড বার্তা। সামরিক গোপনীয়তা ও নিরাপত্তার স্বার্থে অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট কজন অধিনায়ক ও যোদ্ধা ব্যতীত কেউই এই সংকেতের প্রকৃত তাৎপর্য জানতেন না।
রেডিওতে গোপন কোড বার্তাটি বাজামাত্রই প্রস্তুতি সম্পন্ন করে আগস্টের ১৫ ও ১৬ তারিখের মধ্যরাতে দেশের চারটি প্রধান জলপথ ও কৌশলগত বন্দর—চট্টগ্রাম, মোংলা, চাঁদপুর এবং নারায়ণগঞ্জে—একযোগে নজিরবিহীন ও দুঃসাহসিক জলভিত্তিক আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়েন বীর নৌ-কমান্ডোরা। লিমপেট মাইন ব্যবহার করে চালানো তাঁদের এই আকস্মিক ও শক্তিশালী হামলায় তৎকালীন দখলদার পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর বহু যুদ্ধজাহাজ, গানবোট, অস্ত্র ও রসদবাহী বিদেশি জাহাজ চাটগাঁ ও অন্যান্য নদীবন্দরে ধ্বংস হয়ে তলিয়ে যায়। এর ফলে দখলদারদের সব কটি প্রধান বন্দর একযোগে সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে পড়ে। এই অভিযানের মাধ্যমে বিশ্ব দরবারে বার্তা পৌঁছে যায় যে, পূর্ব পাকিস্তানে 'পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে' বলে পাকিস্তান সরকারের চালানো সমস্ত দাবি ছিল ভিত্তিহীন ও মিথ্যা। ফলে বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের গ্রহণযোগ্যতা এক নতুন মাত্রা লাভ করে।
স্মৃতিচারণ পর্বে সশরীরে উপস্থিত থেকে নিজেদের দুঃসাহসিক অভিযানের কথা তুলে ধরেন বীর নৌ-কমান্ডো এ ডাব্লিউ চৌধুরী, আবিউর রহমান, সৈয়দ আহমেদ মজুমদার, চৌধুরী মাহবুবুর রহমান, আব্দুল গফুর এবং মমিন উল্লাহ পাটোয়ারী। তরুণ প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস, নৌ-কমান্ডোদের গৌরবময় ইতিহাস এবং তাঁদের মহান আত্মত্যাগের বার্তা সঠিকভাবে তুলে ধরাই ছিল এই আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য।
অনুষ্ঠানের শুরুতে বাংলাদেশ এবং রাশিয়ার জাতীয় সংগীত মর্যাদার সঙ্গে পরিবেশন করা হয়। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং অপারেশন জ্যাকপটের ওপর নির্মিত প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার তানভীর মোকাম্মেল পরিচালিত একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম বন্দরে জীবনদানকারী রাশিয়ান সেনা ইউরি রেডকিনকে মরণোত্তর সম্মাননা প্রদান করা হয়। পাশাপাশি সাংস্কৃতিক আয়োজনে ‘অপারেশন জ্যাকপট’-এ আক্রমণের সংকেত হিসেবে ব্যবহৃত বিখ্যাত গান দুটি পরিবেশন করেন বিশিষ্ট শিল্পী মকবুল হোসেন ও মনিরা রওনাক বুবলি। সমগ্র অনুষ্ঠানটিতে মুক্তিযুদ্ধ, বন্ধুপ্রতীম আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও বীর শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাবোধের এক অনন্য মেলবন্ধন চিত্রায়িত হয়।
মন্তব্য করুন