

২০২৪ সালে বিশ্বের শীর্ষ ১০০ অস্ত্র প্রস্তুতকারী কোম্পানির আয় বেড়েছে রেকর্ড ৬৭৯ বিলিয়ন (প্রায় ৬.৭৭ লক্ষ কোটি ডলার)। এটি ২০২৩ সালের তুলনায় ৫.৯% বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৫ সালে সামরিক প্রযুক্তি খাতে বৈদেশিক সরাসরি বিনিয়োগ (FDI) উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। প্রথম ৯ মাসে প্রায় ৪.২ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৪ সালের একই সময়ের প্রায় দ্বিগুণ। নতুন কারখানা, উৎপাদন কেন্দ্র ও গবেষণা কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা এর অন্তর্ভুক্ত।
২০২৪ সালে বিশ্বব্যাপী সামরিক ব্যয় ২.৬৮ ট্রিলিয়ন ছুঁয়েছে। ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধির অংশ ছিল। এখন তা বাংলাদেশের মতো দেশেও সম্প্রসারিত হচ্ছে।
সামরিক খাতে পুঁজির প্রবাহ বৃদ্ধির কারণ কী?
এটি আসলে পুঁজিবাদের অন্তর্গত 'অতিরিক্ত পুঁজি সঞ্চয়ের' সংকট। মার্ক্সের মতে, পুঁজিবাদে এমন সময় আসে যখন উৎপাদন ক্ষমতা বাড়তে বাড়তে তা বাজারের ক্রয়ক্ষমতার চেয়ে এগিয়ে যায়, ফলে লাভের হার কমতে থাকে। তখন পুঁজি নতুন ও তুলনামূলকভাবে নিরাপদ বিনিয়োগক্ষেত্র খোঁজে। প্রতিরক্ষা শিল্প সেখানে বিশেষ সুবিধাজনক, কারণ রাষ্ট্র নিজেই বড় ক্রেতা হিসেবে উপস্থিত থাকে এবং অস্ত্রের চাহিদা অনেকাংশে রাজনৈতিকভাবে নিশ্চিত করা যায়।
সামরিক ব্যয় এক ধরনের “কৃত্রিম বাজার” তৈরি করে অতিরিক্ত পুঁজিকে সাময়িকভাবে দখল করে নেয়। অর্থনৈতিক মন্দা বা স্থবিরতার সময়ে সরকার বড় আকারে ব্যয় বাড়িয়ে চাহিদা সৃষ্টি করে অর্থনীতিকে সচল রাখে। পুঁজিপতি শ্রেণী সামাজিক কল্যাণ খাতে ব্যয়কে রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত করে মিডিয়া ব্যবহার করে, এবং জাতীয় নিরাপত্তার যুক্তিতে সামরিক খাতে ব্যয় গ্রহণযোগ্য করে। ফলে সামরিক শিল্প শুধু নিরাপত্তা নীতির অংশ নয়, বরং কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি উন্নয়ন ও কর্পোরেট মুনাফা রক্ষারও উপায় হয়ে দাঁড়ায়।
বৈশ্বিক পরিসরে সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি সাম্রাজ্যবাদী প্রতিযোগিতা ও ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার ইঙ্গিত দেয়। লেনিন ‘সাম্রাজ্যবাদ পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ পর্যায়’ আলোচনায় শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বাজার ও প্রভাব বিস্তারের দ্বন্দ্বের কথা বলেছেন। সমকালীন বিশ্বে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সাথে চীন ও রাশিয়ার প্রতিদ্বন্দ্বিতা বৈশ্বিক অস্ত্র প্রতিযোগিতাকে ত্বরান্বিত করছে।
সামরিক খাতে পুঁজি প্রবাহ বৃদ্ধি ও অস্ত্র উৎপাদন খাতে পুঁজি বিনিয়োগ তাই সাম্রাজ্যবাদের রাজনৈতিক আধিপত্য রক্ষার অভিপ্রায় এবং বৈশ্বিক ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও সংঘাত, তথা পুঁজিবাদের অমিমাংসেয় সংকটের বহিঃপ্রকাশ। এই সংকট থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় পুঁজিবাদী মুনাফাকেন্দ্রিক ব্যবস্থার বিলুপ্তি ও সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা।
লেখক: কলমিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
মন্তব্য করুন